দেশে সাক্ষরতার হার শতকরা ৭১ ভাগ

দেশে সাক্ষরতার হার শতকরা ৭১ ভাগ

 

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ২০১৬ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল শতকরা ৭১ ভাগ। তিনি আজ সংসদে সরকারি দলের সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান। 

মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে পুরুষ সাক্ষরতার হার ৭৩ ভাগ ও নারী সাক্ষরতার হার ৬৮ দশমিক ৯ ভাগ। ২০০৯ সালে দেশে এ হার ছিল ৪৬ দশমিক ১৫ ভাগ।

মুস্তফা কামাল বলেন, জেলাওয়ারী সাক্ষরতার হারের মধ্যে রয়েছে, ঢাকায় ৭০ দশমিক ৫৪ ভাগ, ঝালকাঠিতে ৬৬ দশমিক ৬৮ ভাগ, পিরোজপুরে ৬৪ দশমিক ৮৫ ভাগ, গাজীপুরে ৬২ দশমিক ৬০ ভাগ, নড়াইলে ৬১ দশমিক ২৭ ভাগ, বরিশালে ৬১ দশমিক ২৪ ভাগ, খুলনায় ৬০ দশমিক ১৪ ভাগ, ফেনীতে ৫৯ দশমিক ৬৩ ভাগ, বাগেরহাটে ৫৮ দশমিক ৯৮ ভাগ, চট্টগ্রামে ৫৮ দশমিক ৯১ ভাগ, কুমিল্লা ৫৩ দশমিক ৩২, সিলেট ৫১ দশমিক ১৮, রাজশাহী ৫২দশমিক ৯৮, রংপুর ৪৮ দশমিক ৫৫ এবং ময়মনসিংহ ৪৩ দশমিক ৪৯।

স্মার্টফোনের প্যাটার্ন লক ভুলে গেলে খোলার উপায়

স্মার্টফোনের প্যাটার্ন লক ভুলে গেলে খোলার উপায়

 

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এখন স্মার্টফোন সবার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই স্মার্টফোনে লক ব্যবহার করে থাকেন। তার মধ্যে প্যাটার্ন লক অন্যতম। তবে অনেক সময় এমন হয় নিজেই সেই প্যাটার্ন লকটি ভুলে যান। আবার এই প্যাটার্ন নিজেই ভুলে গেলে দুর্ভোগের শেষ থাকে না। 

এ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে হলে মোবাইল ফোন রিসেট কিংবা কাস্টমার কেয়ারে যাওয়া ছাড়া আপনার হাতে আর কোনো অপশন নাই। কেউ কেউ একে হার্ড রিসেট বলে কারণ এটি সেটের একচুয়্যাল ফ্যাক্টরি সেটিংস ফিরিয়ে আনে। আসুন জেনে নেই কিভাবে আমরা কোনো অ্যান্ড্রয়েড সেট রিসেট দেবো।

প্রথমেই ফোনটির সুইচ অফ করুন, এবার ব্যাটারি ১০ সেকেন্ডের জন্য রিমুভ করুন। আবার ব্যাটারি লাগিয়ে একসঙ্গে ‘up volume key’, ‘Power button’ এবং ‘Home button’ চেপে ধরতে হবে যতক্ষণ না Recovery Mode Screen আসে। স্যামসাং মোবাইলের ক্ষেত্রে উপরের পদ্ধতি কাজ করে।

আবার সিম্ফোনি কিংবা ওয়াল্টন মোবাইলের ক্ষেত্রে মডেল অনুযায়ী ‘up volume key’, ‘Power button’ কিংবা ‘Down volume key’, ‘Power button’ চেপে ধরলেই Recovery Mode Screen চলে আসে এক্ষেত্রে হোম বাটনে চেপে ধতে হয় না।

এরপর ভলিউম কী ব্যবহার করে কার্সর নিচে নামিয়ে ‘wipe data/factory reset’ অপশনে আনুন এবং সিলেক্ট করার জন্য হোমে বাটনে প্রেস করুন। এখন নিশ্চিত করার জন্য আরেকটি স্ক্রিন আসবে এখানে ‘Yes’ বাটন সিলেক্ট করতে হবে। এবার কিছুসময় অপেক্ষা করুন রিসেট হওয়ার পর আপনার ফোন আপনা-আপনি চালু হবে, ততক্ষন অপেক্ষা করুন।

রিসেট করার সময় আপনাকে যা মনে রাখতে হবে:

১. ইন্টারনাল মেমোরি বা ফোন মেমোরির ইন্সটল করা সমস্ত অ্যাপ ও ডাটা হারিয়ে যাবে।
২. ফোন মেমোরিতে সেভ করা ফোন নাম্বার মুছে যাবে।
৩. আপনাকে আবারও আপনার প্রয়োজনীয় অ্যাপগুলো ইন্সটল করে নিতে হবে।
৪. আপনার কাস্টমাইজ করা সমস্ত সেটিংস মুছে যাবে।

কাজে ফিরেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত দুই পাটকলের শ্রমিকরা

কাজে ফিরেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত দুই পাটকলের শ্রমিকরা

 

বকেয়া মজুরির আংশিক হাতে পাওয়ায় কাজে ফিরেছেন খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিকরা। ফলে ১৯ দিন বন্ধ থাকার পর মিল দু’টিতে আবারো উৎপাদন শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে খালিশপুর জুট মিলের শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন।
তবে আন্দোলনরত সিবিএ-ননসিবিএ শ্রমিক নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, দৈনিক মজুরীর ভিত্তিতে পরিচালিত এ দু’টি মিলের শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও ১১ দফা দাবিতে অন্য মিলগুলোতে কর্মবিরতী অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন শ্রমিক নেতৃবৃন্দরা। খুলনা-যশোর রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-ননসিবিএ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন বলেন, ওই মিল দু’টি অনেকটা ব্যক্তিমালিকানাধীন দৈনিক মজুরীর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সেখানে শ্রমিকদের পিএফ ফান্ড ও গ্রাচ্যুইটি সুবিধা নেই। অন্য শ্রমিকদের মতো তাদের বকেয়া মজুরিও বেশি ছিল না। তিনি বলেন, ১১ দাবিতে অনড় রয়েছে বাকি ৬ পাটকলের শ্রমিকরা।
এদিকে দৌলতপুর জুট মিলের প্রকল্প প্রধান মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, শ্রমিকদের বকেয়া তিন সপ্তাহের মজুরির মধ্যে দুই সপ্তাহের মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। আরেক সপ্তাহের মজুরি শিগগিরই পরিশোধ করা হবে। মিলের ৪৭৩ জন শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি খালিশপুর জুট মিলের ২ হাজার ৩৯৮ জন শ্রমিক কাজে ফিরেছেন।
তবে এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম ও যশোরের জেজেআই জুট মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বকেয়া মজুরি দাবিতে ২৮ ডিসেম্বর থেকে খুলনা-যশোরের রাষ্ট্রায়ত্ত ৮টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিলেন

বাকিরা প্রস্তুত, এবার চাপের মুখে এসপিডি

জার্মানিতে মহাজোট সরকার গড়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন শিবির দলীয় অনুমোদন পেয়েছে৷ এবার এসপিডি দলের পালা৷ দলের মধ্যে প্রবল বিরোধিতা সামলানোর চেষ্টা করছে দলীয় নেতৃত্ব৷

২১শে জানুয়ারি বন শহরে এসপিডি দলীয় সম্মেলনের দিকে নজর থাকবে গোটা দেশের৷ দলীয় নেতৃত্ব মহাজোটে যোগ দিতে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিলেও দলের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বেড়েই চলেছে৷ একের পর এক রাজ্য শাখা খোলাখুলি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে৷ এই অবস্থায় শীর্ষ নেতা মার্টিন শুলৎস দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন৷ জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থরাইন ওয়েস্টভেলিয়ায় সোমবার তিনি তৃণমূল স্তরে সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন৷

 

এদিকে প্রস্তাবিত মহাজোট গড়ার লক্ষ্যে বাকি দুই দল সদস্যদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়ে গেছে৷ শুক্রবার সিডিইউ এবং সোমবার বাভেরিয়ার সিএসইউ দলের পরিচালকমণ্ডলী মহাজোট গড়ার ছাড়পত্র দিয়েছে৷ দুই দল আর সময় নষ্ট করতে চায় না৷ রবিবার এসপিডি দল অনুমোদন পেলে সেদিন সন্ধ্যা থেকেই সরকারি জোট গড়ার কাজ শুরু করতে চায় ইউনিয়ন শিবির৷ ফলে এসিপিডি দলের উপর চাপ বাড়ছে৷

 

বিভিন্ন রাজ্য শাখার বিরোধিতা ছাড়াও এসপিডি দলের কিছু নেতা ইউনিয়ন শিবিরের সঙ্গে বোঝাপড়ার সমালোচনা করছেন৷ এমনকি কেউ কেউ নতুন করে দর কষাকষির দাবিও জানিয়েছেন৷ অর্থাৎ তাঁরা দলীয় নেতৃত্বের প্রতি কার্যত অনাস্থা প্রকাশ করেছেন৷ ইউনিয়ন শিবির অবশ্য সেই সম্ভাবনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে৷ দলের অন্যান্য নেতারা ভোটারদের রায়ের প্রেক্ষাপটে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের উপর জোর দিচ্ছেন৷ বিদায়ী সরকারের আইনমন্ত্রী বলেছেন, এফডিপি দলের মতো দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চায় না এসপিডি দল৷

সুস্থ শরীরে দীর্ঘদিন বাঁচতে পান্তা ভাত খান

সুস্থ শরীরে দীর্ঘদিন বাঁচতে পান্তা ভাত খান (ভিডিও)

 

বর্তমানে প্রায় সবার বাড়িতে সকালে গরম ভাত কিংবা নাস্তার প্রচলন। কিন্তু অতীতে  সকাল বেলা মানে পান্তা ভাত, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারে। এ ভাতের সাথে একটু লবণ, শুকনা মরিচ পোড়া অথবা কাঁচা মরিচ এবং পিঁয়াজ। লেবু অথবা লেবু পাতার রস। থাকলে একটু আচার। এখনও গ্রামাঞ্চলে পান্তার প্রচলন রয়েছে। তবে শহরাঞ্চলে এই খাবারের প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ পুষ্টিগুণে ভরপুর এই পান্তা ভাত। চিকিৎসকরা বলছেন, জীবনের যাবতীয় শক্তি নাকি পান্তায় রয়েছে। তাদের দাবি, শরীর চর্চা না করেও পান্তা ভাত খেয়ে বলিষ্ঠ শরীর আর উজ্জ্বল ত্বক, চুলের অধিকারী হতে পারেন যে কেউই। 

সম্প্রতি ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক পরীক্ষা করে দেখেছেন, ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে ১০০ গ্রাম পান্তা ভাতে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম আয়রন তৈরি হয়। সেখানে সমপরিমাণ গরম ভাতে আয়রন থাকে মাত্র ৩.৪ মিলিগ্রাম। এছাড়া ১০০ গ্রাম পান্তা ভাতে পটাশিয়াম বেড়ে হয় ৮৩৯ মিলিগ্রাম এবং ক্যালশিয়ামের পরিমাণ বেড়ে হয় ৮৫০ মিলিগ্রাম। যেখানে সমপরিমাণ গরম ভাতে ক্যালশিয়াম থাকে মাত্র ২১ মিলিগ্রাম। এছাড়া পান্তা ভাতে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে হয় ৩০৩ মিলিগ্রাম। সেখানে সমপরিমাণ গরম ভাতে সোডিয়ামের পরিমাণ ৪৭৫ মিলিগ্রাম।

আমেরিকা নিউট্রিশন অ্যাসোসিয়েশন-এর গবেষণা বলছে, ভাত জলে ভিজিয়ে রাখলে পাকস্থলী প্যানক্রিয়াটিক অ্যামাইলেজসহ আরও কিছু এনজাইমের কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে পান্তা ভাতের জটিল শর্করাগুলো খুব সহজেই হজম হয়ে যায়। এছাড়া পান্তা ভাত ভিটামিন বি-৬ ও ভিটামিন-১২ এর ভালো উৎস। এছাড়া দেহের বহু উপকারী ব্যকটেরিয়া পান্তা ভাতে তৈরি হয়। 

উপকারিতা:
১. পেটের সমস্যার সমাধান। 
২. কোষ্ঠবদ্ধতা দূর হয়। 
৩. শরীর সতেজ থাকে। 
৪. পাশাপাশি শরীরে তাপের ভারসাম্য বজায় থাকে।
৫. রক্ত চাপ স্বাভাবিক থাকে। 
৬. হার্ট সুস্থ থাকে।

অসৎ সমাজে সৎ থাকাই দেশের জন্য বড় অবদান

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসূচি, আন্দোলনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির যে চেষ্টা সেগুলো কি সব বিফলে যাচ্ছে? কোথায় দুর্নীতি আছে তা খুঁজে দেখার দিন শেষ বহু আগে, কোথায় দুর্নীতি নেই, সেটাই এখন খুঁজতে হয়৷

॥ এক ॥

আশির দশকের প্রথমভাগের কথা৷ বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যম বলতে হাতে গোনা কয়টা দৈনিক পত্রিকা আর সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন৷ সামরিক শাসনের কারণে তাদেরও স্বাধীনতা ছিল না৷ তার মধ্যেও কোনো পুলিশ কিংবা সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারি ৫ টাকা ঘুস খাবার খবর পেলে পত্রিকার প্রথম পাতায় গুরুত্বের সাথে ছেপে দিতো সাংবাদিকরা৷ ঘুস-দুর্নীতির ব্যাপারে একটা রাখঢাক, গোপনীয়তার ব্যাপার তখনও ছিল৷ এসব অন্যায়ের প্রতি সাধারণভাবে এক ধরনের সামাজিক ঘৃণা অনুভব করা যেতো৷ সেটা পরে উড়ে গেছে৷

পত্রিকায় ঘুস নিয়ে কোনো খবর দেখি না৷ এর দুটো কারণ হতে পারে, হয় সমাজে আর কেউ ঘুস খায় না অথবা ঘুস দেওয়া-খাওয়া সহনীয়, গ্রহণযোগ্য বা প্রয়োজনীয় একটি ব্যাপার হয়েছে৷ এই দুইয়ের মধ্যে যে দ্বিতীয়টি ঘটেছে তা কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলবে৷ তার মানে, বাংলাদেশের সমাজ ঘুস-দুর্নীতির প্রতি ঘৃণা থেকে সরে এসে দিন দিন এসব অন্যায়ের প্রতি সহনশীল হয়েছে৷ এই আমূল নেতিবাচক গুণগত পরিবর্তন হয়তো একদিনে বা রাতারাতি হয়নি; আস্তে আস্তে হয়েছে, সমাজটা ক্ষয়ে গেছে ভেতর থেকে, যা আমরা হয় টের পাইনি, অথবা পেলেও নির্বিকার থেকে হতে দিয়েছি৷

যেমন করে নদীর পাড় পানির তোড়ে নীচে ক্ষয়ে যেতে থাকে, কেউ দেখে না৷ পরে একসময় বড় মাটির খণ্ড উপর থেকে ধপাস করে ভেঙ্গে পড়ে যায় নদীর পানিতে৷ তখন সবাই ভাঙনটা দেখে৷ এভাবেই পাড় ভাঙতে ভাঙতে গ্রামের পর গ্রাম এমনকি শহর ভেঙে বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে৷ বাংলাদেশের সমাজের, মানুষের সততা, নীতি-নৈতিকতার বোধ ক্ষয়ে যেতে যেতে এভাবেই অদৃশ্য হয়ে গেছে বহু আগে৷ তা-ই বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে দুর্নীতি করার প্রতিযোগিতায় আমরা শীর্ষে বা শীর্ষদের তালিকায় বরাবরই৷

॥ দুই ॥

কোনো পরিসংখ্যান, জরিপ প্রতিবেদন খুব প্রয়োজন পড়ে না৷ মানুষের জীবনের দিকে তাকালেই ঘুস-দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে, তা জানা-বোঝা যায়৷ তবু বিশ্বের নানা দেশ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতির যে ধারনা সূচক গত নব্বইয়ের দশক থেকে প্রকাশ করে আসছে, তাতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ২০০১ সালে৷ সেই থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ দুর্নীতিতে এক নম্বরে ছিল; ২০০৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত এই তালিকায় অবস্থান ৩ থেকে ১৬'র মধ্যে ওঠানামা করেছে৷ আর এই তালিকায় দেশের সংখ্যা ২০০১ সালে ছিল ৯১ আর এখন বছরভেদে ১৮০'র ওপরে-নীচে থাকে৷ টানা ৫ বার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এখন তালিকার ১৫ তে নেমে যাওয়ায় খুশি হবার কথা থাকলেও, তা হওয়া যাচ্ছে না, কারণ, যে স্কোর বা নম্বরের ভিত্তিতে তালিকায় অবস্থান ঠিক হয়, সেই নম্বরের খুব বেশি তারতম্য ঘটেনি৷ দেশে দুর্নীতির বাস্তবতা যেন স্থায়ী স্থিতিশীল অবস্থান পেয়েছে, গুণগত কোনো উন্নতির লক্ষণ নেই৷ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী-শিশুর নানা বিষয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও দুর্নীতির ক্ষেত্রে অনেক পিছনে৷ দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে দুর্নীতি ভুটানে সবচেয়ে কম, আর বাংলাদেশের চাইতে ভুটান ঈর্ষনীয় ব্যবধানে এগিয়ে৷ দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান দুর্নীতিতে সবচেয়ে বাজে অবস্থায়, তারপরেই বাংলাদেশ৷

॥ তিন ॥

ঘুস-দুর্নীতি যেমন সহনীয় গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে আয়োজনও অনেক দৃশ্যমান গত দেড় দশকে৷ একসময় দুর্নীতি দমন ব্যুরো ছিল৷ প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় তাদের কাজের স্বাধীনতা ছিল না৷ দাবির মুখে ২০০৪ সালে হলো দুর্নীতি দমন কমিশন, বলা হলো স্বাধীন৷ এর জন্মলগ্ন থেকে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছি তিন সদস্যের কমিশনকে৷ নিশ্চিত করে বলতে পারি, কেতাবি ভাষা বা বক্তব্যে সেই কমিশন স্বাধীন হলেও কার্যত তা ছিল সরকারের ইচ্ছের পুতুল৷ সে সময় ক্ষমতাসীনদের পছন্দ অনুযায়ী কমিশন সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল৷ তাদের না ছিল কাজ করবার কোনো স্বাধীন ক্ষমতা, না ছিল সাহস৷ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সহায়তায় এক সিভিল সরকার ক্ষমতা নিলে দুর্নীতির বিরদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে৷ বাংলাদেশের ইতিহাসে সরকার, রাজনীতি ও প্রশাসনের এত প্রভাবশালীদের দুর্নীতি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে কাউকেই সাহসী হতে দেখা যায়নি৷ দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রথম সদস্যদের সেই সাহস ছিল না৷ তাই তাদের সরিয়ে নতুন কমিশন করে, তারপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল৷ সেই অভিযান যতটা আওয়াজ তুলেছিল ততটা দৃশ্যমান সাফল্য আইনি লড়াই বা দুর্নীতি প্রতিরোধে অনুভব করা যায়নি৷ বরং পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের আমলে গঠিত নতুন দুর্নীতি কমিশন নিজেই নিজেকে ‘দন্তহীন, নখহীন' বলে অসহায়ত্ব জনসমক্ষে প্রকাশ করে৷ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসূচি, আন্দোলনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির যে চেষ্টা সেগুলো কি সব বিফলে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন জাগে দুর্নীতির ক্রমাগত বিস্তার দেখে৷ কোথায় দুর্নীতি আছে খুঁজে দেখার দিন শেষ বহু আগে, কোথায় দুর্নীতি নেই, সেটা খুঁজতে হয়৷ দেশের দুর্নীতি করে আয় করা অর্থ সম্পদ পাচার হচ্ছে বিদেশে৷ যারা করছেন, তারা আবার দেশপ্রেমিকের সাজে থাকেন৷

॥ চার ॥

প্রায় এক যুগ আগের ঘটনা৷ প্রথম দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে লাইভ টকশো-তে দর্শকদের টেলিফোনে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল৷ একজন দর্শক প্রশ্ন করে বসলেন, ‘‘আপনারা বুকে হাত দিয়ে বলেন, কেউ কোনোদিন কোনো ঘুস খাননি, দুর্নীতি করেননি৷'' এই প্রশ্নে রাগ ও বিব্রত হলেন অনুষ্ঠানের মানুষেরা, কিন্তু বুকে হাত দিয়ে কেউ কিছু বলতে পারলেন না৷ এজন্য কেউ লজ্জিত নন, বরং প্রশ্ন শুনে ক্ষুব্ধ৷ অনুষ্ঠান পরিচালক  এমন প্রশ্ন করায় নিরুৎসাহিত করলেন৷ যেই প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রের দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিষ্ঠিত, তার শীর্ষব্যক্তিরা যদি নিজের সততার প্রশ্নে পরাজিত হন, তবে তাদের অধীনে শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সততা প্রতিষ্ঠিত হওয়া অসম্ভব৷ সমাজ দুর্নীতি বান্ধব হয়ে যাওয়ায় এমন লজ্জাহীনভাবে সমাজের বড় বড় পদ ও দায়িত্বে দুর্নীতিবাজদের টিকে থাকার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ অন্যায়, অপরাধ করা যাবে, বরং তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অন্যায়, বাজে আচরণের পরিচায়ক৷ ঘুস-দুর্নীতি, অন্যায়-অপরাধের পক্ষে সাফাই গাওয়ার মতো মানুষের অভাব নেই৷ অনেকে এমন একটা যুক্তি দাঁড় করাতে চান যে, যাঁরা সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ, তাঁদের জীবন চালাবার জন্য দুর্নীতি করার আধিকার রয়েছে, নাহলে চলবে না জীবন৷ তাই একই রকম আয় করে যারা সৎ থেকে জীবন চালাচ্ছে, তারা উদাহরণ না হয়ে সমাজের বোকা শ্রেণী হয়ে যাচ্ছে৷ ফলে সততাকে উৎসাহিত না করে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে৷ অনেকে মনে করেন, যাঁরা ধনী, তাঁরা বোধ হয় দুর্নীতি করেন না৷ এটা ভ্রান্ত ধারণা৷ ধনীরা আরও বড় ধরনের দুর্নীতির সাথে যুক্ত৷ আসলে দুর্নীতি সমাজের ক্ষুদ্রতম পর্যায় থেকে বৃহত্তম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত৷ সমাজে সরকারি অফিস আদালতের দুর্নীতি নিয়ে যত কথা হয়, ততটা বেসরকারি খাতের দুর্নীতি নিয়ে হয় না৷ অথচ বেসরকারি খাতে, ব্যবসা, বাণিজ্যে দুর্নীতির মানসিকতা এমন পর্যায়ে গেছে যে, মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেও মুনাফার পেছনে ছুটতে দ্বিধা করে না লোকে৷ মানুষের জীবন ধারণের মৌলিক প্রতিটি বিষয় এমনভাবে বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে যে চিন্তার জগত ও মানসিকতাটাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে৷

॥ পাঁচ ॥

Julfikar Ali Manik, Journalist aus Bangladesch

জুলফিকার আলি মাণিক, সাংবাদিক

বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, বিচারক, অর্থাৎ রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভ, নির্বাহী, বিচার ও আইন প্রণয়ন বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি স্তর যদি আকণ্ঠ দুর্নীতিতে ডুবে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে  সাংবাদিকতার দায়িত্ব সেগুলোকে ঠিক করার, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা, নিজেদের স্বাধীন কাজ দিয়ে৷ কিন্তু সাংবাদিকরা এই দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজেরই অংশ, অন্য কোথাও থেকে আসেনি৷ এমন ব্যাখ্যা-যুক্তিতে যখন সাংবাদিকদেরও ঘুস-দুর্নীতিকে গ্রহণযোগ্য করার প্রচেষ্টা দেখা যায়, তখন বুঝতে হবে দেশে সর্বশেষ আশার জায়গাটিও তিরোহিত হতে চলেছে৷ আমরা দুর্নীতি বললে শুধু ঘুস বা অর্থ আত্মসাৎ মনে করি, কিন্তু দুর্নীতির রূপ বহুবিধ৷ নিজের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করা বা অন্যের সাথে অনৈতিক আচরণ করাও দুর্নীতির মানসিকতা৷ ছোট বেলার পাঠ্যে ছিল, ‘‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে৷'' সেই বিবেচনায় দুর্নীতি দেখেও চুপ করে থাকা অন্যায়৷ বছরখানেক আগে বৈশাখী টেলিভিশনে চিড়িয়াখানায় দুর্নীতির ওপর এক প্রতিবেদনে কর্মকর্তারা ক্যামেরায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করছিলেন, কিন্তু গোপনে ধারণ করা ব্যক্তিগত আলাপে এক কর্মকর্তা বলছিলেন, আত্মীয়রা তার বাসায় বেড়াতে গেলে বলেন, ‘‘চিড়িয়াখানায় দুর্নীতির যে খবর গণমাধ্যমে দেখেন তাতে, তার টাকায় চা খাওয়াও উচিত না৷'' দুর্নীতি সমাজ থেকে কমাতে হলে প্রতিরোধটা এভাবেই ঘর ও সমাজ থেকে আসতে হবে৷ আমরা মুখে বলি, ‘‘দুর্নীতি পছন্দ করি না, দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স৷'' কিন্তু দুর্নীতিবাজদের সাথে সকল সংস্রব রক্ষা করে চলা আসলে তাদের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় ও গ্রহণযোগ্যতাই দেয়৷ বড় চমক দেখা যায় তখন, অসৎ ও দুর্নীতিবাজরা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন সাধুদের চাইতেও শক্ত গলায়৷ এমনি নানাভাবে সৎ লোকেরা সমাজে একঘরে হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অসৎ লোকরা একঘরে হলে সমাজে সততা ফিরে আসতো৷

যেসব প্রজন্মের মধ্যে ঘুস-দুর্নীতি গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, সেই প্রজন্মকে শুদ্ধ করা কঠিন, কেননা, তাদের মানসিকতা পরিবর্তন অসম্ভব এখন৷ যেটা সম্ভব তা হলো, দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা নতুন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গড়ে তোলা, যা দূর ভবিষ্যতে অবস্থার উন্নতি করতে সহায়তা করবে৷ ফলে ধৈর্য ধরে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাওয়া ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ৷ ঘুস-দুর্নীতিকে ঘৃণা করা এবং দুর্নীতিবাজ অন্যায়কারীকে সামাজিকভাবে বর্জন করার শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিশু পর্যায় থেকে থাকতে হবে৷ এমন শিক্ষা শিশুদের সৎ মানসিকাতায় বেড়ে উঠতে সহায়তা করবে এবং তা পরিবারেও প্রভাব ফেলবে৷ সৎ সমাজে সৎ থাকা যত সহজ, অসৎ সমাজে সৎ থাকা ততই কঠিন৷ এই কঠিন কাজ যাঁরা করছেন, তাদেরকে সমাজের ‘হিরো' বা নায়ক হিসেবে তুলে ধরতে হবে অন্যদের উৎসাহিত করতে৷ কেউ যদি জানতে চায়, দেশের প্রতি আমার অবদান কী? আমি বলি, ‘‘অসৎ, দুর্নীতিপ্রবণ সমাজে নিজেকে যে সৎ রাখতে পেরেছি, এটাই একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি আমার অবদান৷ লোভ সংবরণ করে সবাই গর্ব অনুভব করার জায়গাটা এখানে খুঁজে পেলে দেশটা সত্যি সোনার বাংলা হয়ে যেতো রাতারাতি৷ এই গর্ব অনুভব করতে পারার প্রক্রিয়াটা আপনা-আপনি হবে না, পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে শেখাতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও কর্মস্থলে৷ এটাকে খুব বড় কাজ বলে মনে করি৷

Make Website

 

Quick Contact