চালের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে

বাংলাদেশে চালের মজুত গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে৷ এখন দেশের গুদামগুলোতে মজুত চালের পরিমাণ এক লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন৷ ২০০৯-২০১০ অর্থবছরের এই সময়ে খাদ্যগুদামে চাল মজুদ ছিল পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন৷

বাজারে সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে৷ আর চালের দাম বাড়ার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে গত পাঁচ মাস ধরে৷ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী সরু চালের কেজি গত সপ্তাহে ছিল ছিল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা৷ আর চলতি সপ্তাহে কেজিতে বেড়েছে গড়ে ২ টাকা করে৷ মোটা চালের দামও একই রকম৷ কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৪৬ থেকে হয়েছে ৪৮ টাকা৷ গত একমাসে সব ধরনের চালের দাম ৪ থেকে ৮ শতাংশ৷ আর বছরে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে৷

আর চালের এই অব্যাহত দাম বাড়ায় বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষ৷ দিনাজপুর থেকে কাজের জন্য ঢাকায় আসা দিনমজুর আলি হোসেন একটি বাস কোম্পানিতে হেলপারের কাজ করেন৷ পরিবার নিয়ে থাকেন শ্যামলী এলাকায়৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাসের ট্রিপ অনুযায়ী টাকা পাই৷ যানজটের কারণে ট্রিপ কম হওয়ায় আয়ও কমে যাচ্ছে৷ আর চালসহ জিনিসিপত্রের দামও বাড়ছে৷ আগে দিন শেষে চারশ টাকা পেলেই চাল ডাল কিনে বাসায় যেতে পারতাম৷ এখন পারি না৷ চাল কিনতেই বাড়তি খরচ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা৷ চালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাছ, মাংস ও সবজি, হলুদ, মরিচ, পেয়াজের দাম৷ তাই ৪০০ টাকার বাজার করতে এখন লাগে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা৷''

পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক দরিদ্র ও দিনমজুর পরিবার হিমশিম খাচ্ছে৷ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, কোনো কোনো পরিবারের সদস্যরা এখন দুই বেলার পরিবর্তে একবেলা খাচ্ছেন৷ শহরে ওএমএস-এর চালের জন্য লাইন লম্বা হচ্ছে৷ অনেকে আবার কষ্টে থাকলেও সামাজিক কারণে এই লাইনে দাড়িয়ে চাল কিনতে পারছেন না৷

চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘‘এবার হাওরে জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার কারণে ধানের যে ক্ষতি হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে৷ ঢাকার বাবুবাজার- বাদামতলী চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিজাম উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘গত তিন বছর ধরে চাল আমদানি করা হয়নি৷ দেশে উৎপাদিত চাল দিয়েই চাহিদা মিটেছে৷ কিন্তু এবার হঠাৎ হাওড়ে ফসল নষ্ট হওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে৷''

তিনি বলেন, ‘‘এখন ভারত থেকে কিছু চাল আমদানি হচ্ছে৷ কিন্তু চালের ওপর আমদানি ট্যাক্স নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বড় চালানে কেউ চাল আমদানি করছেনা৷ এখন চাল আমদানিতে শতকরা ২৫ ভাগ ট্যাক্স দিতে হয়৷ সরকার বলছে ট্যাক্স কমাবে৷ তাই কেউ আমদানি করতে সাহস পাচ্ছেনা৷ ট্যাক্স কমালে এখন যারা আমদানি করবেন তারা লোকসানে পড়বেন৷ সরকারের উচিৎ ট্যাক্সের বিষয়টি এখনই ঠিক করে ফেলা৷''

সরকারের হিসাবে হাওরের বন্যায় ছয় লাখ টন বোরো ধান নষ্ট হয়েছে৷ এখন ছয় লাখ টন চাল আমদানি করলেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে৷ তাই এই চাল আমদানির সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার৷ এর অংশ হিসেবে দেড় লাখ টন চাল আমদানির টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে৷ আরও তিন লাখ মেট্রিক টন ভিয়েতনাম থেকে জিটুজি আমদানির চুক্তি হয়েছে৷ কিন্তু যে দরে টেন্ডারে চাল পাওয়া যাচ্ছে জিটুজি পর্যায়ে দর তার থেকে বেশি৷

গত ১৪ জুন আবার আড়াই লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি৷ খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এবার হাওড়ে বন্যা ছাড়াও এবার ব্লাস্ট রোগে ফসলহানি হয়েছে৷ কিন্তু সেজন্য এখন চালের সংকট হওয়ার কথা নয়৷ সংকট হওয়ার কথা ৩-৪ মাস পরে৷ আর তা যাতে না হয় সেজন্য এখনই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি৷ কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চালের মজুদ থাকার পরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে৷ তারা ভয় ছড়িয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে৷ এই সব মজুতদার ও বিএনপি ঘরানার ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে৷ তবে আমারা এরইমধ্যে নিয়ন্ত্রণে এনেছি৷''

তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাল আমদানি শুরু করেছি৷ এনবিআরের কাছে চালের ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের লিখিত আবেদন করেছি৷ প্রত্যাহার করা হলে চালের দাম কমে যাবে৷''

সরকার এবার ৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন কম হবে বললেও বাস্তবে এটা আরো বেশি৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘‘হাওর অঞ্চলের সাত জেলায় এ বছর আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে৷ আর ১৯ জেলায় ধান ক্ষেতে ছত্রাকের আক্রমণে (ব্লাস্ট রোগ) উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ এই দুই কারণে এ বছর ১০ লাখ টনের বেশি বোরো ধান নষ্ট হয়েছে৷''

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ খায় বিআর-২৮ এবং পাইজম চাল৷ এই দুই প্রকারের চালেও দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি৷ বাজারে এখন প্রতি কেজি বিআর-২৮ চালের কেজি ৫২ থেকে ৫৬ টাকা৷ আর পাইজম চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৪ টাকা৷ অথচ জানুয়ারিতেও এই দুই প্রকার চালের দাম ছিল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা৷ আর গত বছরের এই সময় দাম ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা৷ এক বছরে এই চালে দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫১ শতাংশ৷

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন ধান-চাল উৎপাদন হয়৷ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাদ্য চাহিদা রয়েছে ৩ কোটি টনের মতো৷ বাকি প্রায় ৬০ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে৷ গত বছর সরকারিভাবে ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানি করা হয়েছে৷ কিন্তু তারপরও এবার চাল সংকটের মুখোমুখি বাংলাদেশ৷

Make Website

 

Quick Contact