৪৫ দিনে দেড়শ’ কোটি টাকার বন উজার

বাংলাদেশে নতুন করে আসা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কারণে এরইমধ্যে বনের দেড়শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে৷ সার্বিকভাবে পরিবেশেরও অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে৷ কিন্তু এই ক্ষতির জন্য মন্ত্রণালয়কেই দায়ী করতে চান পরিবেশবাদীরা৷

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে নতুন করে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে কক্সবাজার এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে৷ কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, ‘‘এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের কারণে ১৫০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বনজ সম্পদ ধ্বংস হয়েছে৷’’

কমিটির সভাপতি হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে মানবিক কারণে৷ তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণও যাচ্ছে৷ কিন্তু তাঁদের জ্বালানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা প্রাকৃতিক বন থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করছে৷ এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে৷ টেকনাফ রোডের গাছগুলো উজাড় হয়ে যাচ্ছে৷ বন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শুধু বনের ক্ষতি দেড়শ' কোটি টাকা ছাড়িয়েছে৷ পরিবেশের ক্ষতির হিসাব অনেক বেশি৷’’

হাছান মাহমুদ আরো বলেন, ‘‘ইতিমধ্যে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমেছে৷ বনের পাশাপাশি পরিবেশের অন্যান্য খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করে আগামী বৈঠকে জানানোর জন্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে৷’’

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে পাহাড়, জলাশয়, সমুদ্রসৈকতসহ পরিবেশের অন্যান্য খাতেরও ক্ষতি হয়েছে৷ তবে কোন খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি ওই ব্রিফিংয়ে৷ কমিটি বনের ক্ষতি কমাতে রোহিঙ্গাদের জ্বালানিসাশ্রয়ী চুলা সরবরাহের সুপারিশ ও প্রয়োজনে তাঁদের জন্য বায়োগ্যাস প্লান্ট বসানোর পরামর্শ দিয়েছে৷

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য টিপু সুলতান সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘এটা সম্ভব হলে বনের ক্ষতি ৫০ শতাংশ কমে আসবে৷ রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার পর যেসব এলাকা ফাঁকা হচ্ছে, সেখানে নতুন করে বনায়নের সুপারিশ করা হয়েছে৷’’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র মুখপাত্র ইকবাল হাবিব ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এর জন্য দায়ী সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়৷ সুনির্দষ্ট পরিকল্পনার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷ শুরুতেই যদি পরিকল্পনা করা হতো তাহলে ক্ষতি অনেক কম হতো৷’’ কী ধরণের পরিকল্পনা নেয়া যেতো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তাঁদের আশ্রয়ের জন্য যতটা সম্ভব পাহাড় ও বন বাদ দিয়ে সমতল ভূমি বেছে নেয়া যেতো৷ আবার পাহাড় ও বনভূমি সব জায়গায় নাই৷ সেইসব জায়গা বেছে নেয়া যেতো৷ আর জ্বালানীর বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতো৷ শুধু গাছপালা বা পাহাড় কাটা নয়, পয়নিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকার কারণেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে৷’’

তবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের কারণে বন ও পরিবেশের কী পরিমান ক্ষতি হয়েছে সে হিসাব সরকারের কাছে এখনো নাই৷ ক্ষতি অবশ্যই হয়েছে৷ সংসদীয় কমিটি যদি কোনো ক্ষতির হিসাব পাঠায়, আমরা তা দেখবো৷’’

তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হবে৷ সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে৷ এখানে পদক্ষেপ নেয়ার কী আছে? তবে তাঁদের আশ্রয়ের বিষয়টি সাময়িক৷ তাঁরা এখানে স্থায়ীভাবে থাকবে না৷ তাঁরা আসছে, আরো আসবে৷ ফেরত নেয়ার কথা চলছে৷ দেখা যাক কী হয়৷’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘যারা সরকারে থাকে না, তাঁরা তো সব জাদুর মতো করে ফেলে৷ আগাম পরিকল্পনা করা অসম্ভব, কারণ, রোহিঙ্গারা তো আর বলেকয়ে আসেনি৷ তাঁরা যে যার মতো নদী পাহাড় স্থলপথ দিয়ে এসেছে৷ এসে যে যার মতো থাকা শুরু করেছে৷’’

কক্সাজারের বন বিভাগ জানিয়েছে, সম্প্রতি আসা রোহিঙ্গারা টেকনাফ ও উখিয়া এলাকার প্রায় ৪ হাজার একর বনাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে৷ এর মধ্যে উখিয়া রেঞ্জের কুতুপালং, থাইংখালী ও আশাপাশের ৩ হাজার, টেকনাফ রেঞ্জের ৪৫০ একর, শিলখালী রেঞ্জের ৩৭৫ একর ও পুটিবুনিয়া রেঞ্জের ৫০ একর পাহাড়ি জায়গা রোহিঙ্গাদের দখলে রয়েছে৷ এর বাইরেও কিছু এলাকায় তাঁদের বসতি রয়েছে৷’’

সরকার কুতুপালংয়ের বালুখালি এলাকায় দুই হাজার একর বন এবং পাহাড় অধিগ্রহণ করেছে সব রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় রাখার জন্য৷ জানা গেছে, আরো এক হাজার একর অধিগ্রহণ করা হবে৷ এটা করা হয়েছে ২৫ আগস্টের পর থেকে৷ তবে এর আগে ১৯৭৮ সাল থেকে কয়েক দফায় আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য  চার হাজার একর বন ও পাহাড় অধিগ্রহণ করা হয়৷ এসবই বনবিভাগের সংরক্ষিত বন ও পাহাড়৷

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএইচএম রায়হান সরকার দীর্ঘ দিন ধরে রোহিঙ্গাদের বসবাস এবং পরিবেশের ওপর এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন৷ তিনি গত শনিবার ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘পুরনো এবং নতুন রোহিঙ্গা আশ্রয় কেন্দ্র গড়েই উঠেছে সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে৷ এখানে পরিবেশকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি৷ এরই মধ্যে কক্সবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে৷ কক্সবাজার ও বান্দরবানে হাতির সংখ্যা কমে যাচ্ছে৷ গাছপালা উজাড় হচ্ছে৷ বন না থাকায় নানা ধরণের প্রাণি ও পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে৷ সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো পাহাড় ধস আরো বেড়ে যাবে৷’’

Make Website

 

Quick Contact