Bangladesh

উন্নয়ন প্রকল্পের ৪৪ শতাংশই বৈদেশিক ঋণে

বর্তমান সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটি বড় অগ্রাধিকার প্রকল্প। সে বিবেচনায় সরকার প্রতিবছরই হাতে নিয়েছে বড় আকারের উন্নয়ন বাজেট। সদ্যোবিদায়ি অর্থবছরে সরকার যে উন্নয়ন বাজেট হাতে নিয়েছিল তার ৪৪ শতাংশই ছিল বৈদেশিক ঋণের অর্থের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ ছিল দুই লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থসংকটে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭৪ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায়, মোট ৭০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। আর চলতি অর্থবছরে (২০২৩-২৪) সরকারের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা।

এতে বৈদেশিক সহায়তা ধরা হয়েছে ৯৪ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ি অর্থবছরের চেয়েও ২৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিদায়ি ও চলতি অর্থবছরের বাজেট এবং একনেক সভার অনুমোদিত প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ১৮টি একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ি অর্থবছরে মোট এক লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার ১৭৩টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে বিদেশি অর্থায়ন রয়েছে ৬৯ হাজার ৮৬১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বাকি অর্থায়ন সরকারের ও সংস্থাগুলোর নিজেদের। একনেকে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে বৈদেশিক ঋণের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে বেশি। অর্থবছরের প্রথম দিকে স্থবিরতা থাকলেও শেষের দিকে তোড়জোড় বেড়েছিল সরকারের।

বিদায়ি অর্থবছরে সর্বশেষ একনেক সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প অনুমোদন কেন দেওয়া হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব সত্যজিত কর্মকার বলেছিলেন, ‘এখন দেশে বেশি বেশি বিদেশি ঋণের প্রকল্প দরকার। বাংলাদেশ ভালো ঋণগ্রহীতা। এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি বাংলাদেশ।’ ওই দিন ঋণ গ্রহণ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা ঋণের টাকায় ঘি খাই না, সরকার ঋণ নেয় জনগণের উন্নয়নের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য।’

বিদায়ি অর্থবছরের শুরুর দিকে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে একনেক সভা খুব বেশি অনুষ্ঠিত হয়নি। যে কয়েকটি সভা হয়েছিল তাতে বিদেশি ঋণের প্রকল্প অনুমোদনের খুব একটা প্রবাহ ছিল না। যেমন—প্রথম একনেকে মোট দুই হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিদেশি অর্থায়ন ছিল না। দ্বিতীয় একনেকে ১০ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্প অনুমোদন পায়, এর মধ্যে বিদেশি অর্থায়ন ছিল চার হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের তৃতীয় একনেক সভায় ১৫ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার আটটি প্রকল্প অনুমোদন পায়, যাতে বিদেশি অর্থায়ন ছিল তিন হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। তবে বিপরীত চিত্র অর্থবছরের শেষের দিকে। শেষ দিকে এসে বিদেশি ঋণের প্রবাহ কিছুটা বাড়ে। সর্বশেষ দুটি একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয় ৩৪টি প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২০ হাজার ৩১৮ কোটি ৪৫ লাখ, বৈদেশিক ঋণ থেকে ১৫ হাজার ৩৩৪ কোটি ৬৭ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৯৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

সরকার বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন খুব কম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতা না থাকায় আশানুরূপ পরিমাণে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হচ্ছে না। ফলে পাইপলাইনে জমছে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ। অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতার অভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাস শেষে (জুলাই-মে) সংশোধিত এডিপির মাত্র ৬১.৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬৪.৮৪ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া ও সামর্থ্য এখন পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সরকার দেশের টাকায় যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে সেগুলো তারা ধার নিয়ে করে। আবার কোনো ক্ষেত্রে এই ধারের টাকা নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। যদি তা সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হতো তাহলেও ভালো ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে তা অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।’

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button