Hot

পূর্ব সিলেটে সশস্ত্র মহড়া দিলো কারা?

আওয়ামী লীগ জমানায় পূর্ব সিলেট ছিল এক আতঙ্কের নাম। টর্চার সেল, প্রকাশ্য অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি সবই হতো এখানে। মানুষ ছিল সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি। হাঁটতে, বসতে দিতে হতো চাঁদা। না দিলে টর্চার সেলে নিয়ে করা হতো নির্যাতন। ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই প্রেক্ষাপট কয়েক মাস পরিবর্তন ছিল। পূর্বের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়েছিল গা-ঢাকা। কিন্তু একটি সশস্ত্র মহড়া, ককটেলবাজি ফের আতঙ্কিত করে তুলেছে এলাকার মানুষকে। ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তাহীন। এমন ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার রাতে। কিন্তু রেশ এখনো রয়ে গেছে। আতঙ্ক কাটছে না। তাহলে কী আগের অবস্থা ফিরে আসছে- এ প্রশ্ন সবার। অমীমাংসিত একটি প্রশ্ন- মহড়া দিলো কারা? কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন না, স্বীকারও করছেন না। রাতের আঁধারে ঘটেছিল ওই ঘটনা। রাত তখন সাড়ে ৮টা। হঠাৎ করেই ১০-১২টি মোটরসাইকেলে হেলমেট পরে যুবকরা তামাবিল অভিমুখে যায়। দাঁড়ায় শাহপরান (রহ.) মাজারের অদূরের ফটকে। হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র। মুখে স্লোগান। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন-গণ-অভ্যুত্থানের আগে অহরহ মহড়া হতো। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম মহড়া দেয়ায় আতঙ্ক দেখা দেয়। মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে যায় শাহপরান বাজার। ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী বাজার বন্ধ করে দেন। কয়েক মিনিট ওখানে অবস্থানের পর সশস্ত্র ওই বাহিনী যায় খাদিম চৌমুহনী বাজারে। বাজারের কাছাকাছি থাকা ছাত্রলীগ ক্যাডার হাবিবুর রহমান পঙ্কি ও মুজিবুর রহমান রকি’র বাসা।

চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মহড়া দেয়ার সময় ওই যুবকরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেয়। এক পর্যায়ে তারা রকি, পঙ্কির বাসায় ইটপাটকেল ছুড়ে। পরে তারা চলে আসে। এরপর সেখানে রকি ও পঙ্কির নেতৃত্বে বের হয় একটি গ্রুপ। ককটেলবাজি করে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। তারা জানিয়েছেন-মহড়ার সময় যুবকদের হাতে ধারালো অস্ত্রের মধ্যে দা ও রামদা ছিল। এদিকে শাহপরান ও খাদিম চৌমুহনী এলাকার ঘটনার পর নগরের মেজরটিলা মোহাম্মদপুরে ১০-১২টি মোটরসাইকেল নিয়ে ওই যুবকরা মহড়া দেয়। তারা মোহাম্মদপুরের মসজিদের পাশে থাকা সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদের বাসায় ইটপাটকেল ছুড়ে। এক পর্যায়ে ভাঙচুর করে। এ সময়ও তারা একই স্লোগান দেয়।  মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও সিলেট নগর স্বেচ্ছাসেবকদলের আহ্বায়ক মাহবুবুল হক চৌধুরী ভিপি মাহবুব। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন-কারা এই হামলা করেছে সেটি এখনো অজানা। বিএনপি কিংবা অঙ্গসংগঠনের কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। 

এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, ইকবাল চেয়ারম্যানের ছেলের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ওই দিন হামলার ঘটনা ঘটে। তবে হামলাকারীদের চিহ্নিত করা যায়নি। ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্লোগানে ঘটনার জন্য সন্দেহের তীর জামায়াত ও শিবিরের কর্মীদের দিকে। তবে শাহপরান এলাকার জামায়াত নেতা আব্দুল বাছিত নাদির মানবজমিনকে জানিয়েছেন, জামায়াত কিংবা শিবির গোপনে কিছু করে না।  যে কাজ করবে প্রকাশ্যেই করবে। এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াত ও শিবিরের কেউ জড়িত নয়। তিনি বলেন- পঙ্কি ও রকির সঙ্গে অনেকেরই নানাভাবে বিরোধ আছে। হরিপুরের চোরাচালান, তাদের গ্রুপের আরেক অংশ নতুবা সাম্প্রতিক সময়ে বাগান এলাকার চোরাচালানের চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ে এই মহড়া হতে পারে। অভিযোগের তীর আছে খাদিমপাড়া ইউপি বিএনপি’র সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম আজাদের দিকেও। তবে তিনি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন- ঘটনাটি নগরে। তিনি পুরো ঘটনা জানেনও না। ওই দিন শাহপরানের সূচনা সেন্টারে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সম্মেলন ও কাউন্সিলে ছিলেন। তার জানা মতে; ঘটনার সঙ্গে বিএনপি কিংবা অঙ্গসংগঠনের কারও কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। 

সবাই ওই দিন সম্মেলন ও কাউন্সিল নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এদিকে-শাহপরান গেইটে ঘটনার পর বারবারই পুলিশকে কল করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিক সেখানে যায়নি। সশস্ত্র মহড়া, ককটেলবাজির আধাঘণ্টা পর পুলিশ যায়। খবর পেয়ে সেখানে সেনাবাহিনীর একটি টিমও যায়। তার আগেই মহড়ায় অংশ নেয়া ক্যাডাররা এলাকা ত্যাগ করে চলে যায়। শাহপরান তদন্তকেন্দ্রের সাব- ইন্সপেক্টর সাজিদ হোসাইন জানিয়েছেন, ঘটনার পর পুলিশ গিয়ে একজনকে আটক করেছিল। তবে মহড়া, ককটেলবাজির সঙ্গে পঙ্কি ও রকিদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সশস্ত্র মহড়ার আগের দিন ঢাকায় আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল পঙ্কির ভাই রুহিত। তাকে ছাড়িয়ে আনতে তার পিতা রাজা মিয়াও ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। রুহিত গ্রেপ্তারের খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে একটি অংশ মহড়া সহ নানা ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা জানান, গণ-অভ্যুত্থানের কয়েক মাস ছাত্রলীগ নেতা পঙ্কি, রুহিত ও রকি গা-ঢাকা দিয়েছিল। ওই সময় তাদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা আবার প্রকাশ্যে এসেছে। এরপর থেকে একের পর এক অঘটন ঘটছে। ঘটনার দিন তারা কেবল পাল্টা মহড়াই দেয়নি, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় এবং শাহপরান ফটকে আসার আহ্বান জানায়। তাদের এই আহ্বানে ক্ষুব্ধ এলাকায় থাকা আওয়ামী লীগ সহ অঙ্গসংগঠনের তৃণমূলের নেতারা। এ ঘটনার পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ি বেড়েছে বলে জানান তারা।  

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button