Bangladesh

ভোগান্তির শেষ নেই জন্মনিবন্ধনে

দক্ষিণ খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা মো. কামাল উদ্দিন। তার নাতনির জন্মনিবন্ধন করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের নতুন সার্ভারে। মা-বাবার সঙ্গে বিদেশ যেতে পাসপোর্টের জন্য নিবন্ধনটি অনলাইনও করেছেন। পাসপোর্টের ফরম পূরণ করে জন্মনিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমাও দিয়েছেন অফিসে। সব ঠিকঠাক থাকলেও বিপত্তি বাধে নিবন্ধন যাচাই করতে গিয়ে। সেখানকার সার্ভারে নিবন্ধনটি পাওয়া যাচ্ছে না। পরবর্তীতে আবার কামাল উদ্দিন সিটি করপোরেশনে যান। সেখানেও কর্মকর্তারা কোনো সমাধান দিতে পারেননি। কোনো উপায় না পেয়ে তিনি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে যান। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে ডিএসসিসি আলাদা সার্ভার করায় রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কোনো সমাধান দিতে পারেনি। হতাশা নিয়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন কামাল উদ্দিন।

একই ভোগান্তিতে পড়েছেন শরীফুল ইসলাম। তার মেয়ে সাবরিনার নামে জমি রেজিস্ট্রেশন করবেন সেই জন্য জন্ম নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে সাবরিনার নাম সার্ভারে পাওয়া যাচ্ছে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন। ডিএসসিসির দফতরে ঘুরেও কোনো সমাধান পাননি তিনি। এই ভোগান্তিতে শুধু কামাল উদ্দিন ও শরীফুল ইসলাম নন। তাদের মতো শত শত মানুষ ডিএসসিসির নতুন ওয়েবসাইটে জন্মনিবন্ধন করে দফতরে দফতরে ঘুরে জুতার তলা ক্ষয় করছেন। সমস্যার কোনো কূল কিনারা পাচ্ছেন না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত ৪ অক্টোবর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন ওয়েবসাইটে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করে।

সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডে এই কার্যক্রম চলছে। যদিও ডিএসসিসির এ উদ্যোগের আইনি ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এ বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। তারা বলছে, বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সনদ দেওয়ার দায়িত্ব রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের। আর এ কার্যক্রম পরিচালনায় শুধু নিবন্ধকের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এই নিয়মে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সেবা দেওয়া হচ্ছে নাগরিকদের। এখন কোন নিয়মে ডিএসসিসি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আবেদন গ্রহণ ও সনদ বিতরণ করছে, তার কিছুই জানে না তারা। প্রসঙ্গত, ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কাজে করপোরেশনের ব্যয়ের পুরো টাকা সরকার পরিশোধ না করা পর্যন্ত নিবন্ধনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ফি পরিশোধে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা সীমিত পরিসরে চালু হয় গত এপ্রিল মাসে। পরে পর্যায়ক্রমে ই-পেমেন্ট বা অনলাইনে ফি পরিশোধ সারা দেশে চালু করে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। তবে এই ব্যবস্থা চালুর পর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা সরাসরি চলে যাওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের কাজ বন্ধ রাখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দাবি, এ খাতে ফি বাবদ আয় সিটি করপোরেশনের তফসিলভুক্ত আয় হিসেবে আলাদা কোডের মাধ্যমে নিজস্ব তহবিলে জমা হতে হবে অথবা তাদের যা ব্যয় হয়, তার পুরোটা সরকারকে দিতে হবে। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কাজে তাদের বছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ফির টাকা তাদের তহবিলে জমা না হলে বছরে এই পরিমাণ টাকা প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে সরকারের। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম তার একান্ত সচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন-১ অধিশাখার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকীকে সমস্যা সমাধানে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নূরে আলম সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জন্ম ও মৃত্যনিবন্ধন নিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করছি। তবে ডিএসসিসির নতুন ওয়েবসাইটে জন্মনিবন্ধন বিষয়টি মন্ত্রণালয় অবহিত নয় বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. রাশেদুল হাসান বলেন, নাগরিকদের সুবিধার জন্য আমরা অনলাইন সেবা চালু করেছি। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ফি অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে। একমাত্র ডিএসসিসি তা মানতে নারাজ। তারা আগের মতোই চালান আকারে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে চায়। কিন্তু জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ফি সিটি করপোরেশন তফসিলভুক্ত আয় হিসেবেই গণ্য করার আইনগত সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় শিশুদের জন্মনিবন্ধন এবং নাগরিকদের মৃত্যুনিবন্ধন সনদ দেওয়ার দায়িত্ব নিবন্ধকের তথা সংস্থার মেয়রের। তাই আইন অনুযায়ী ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ওয়েবসাইটের তথ্য জাতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সংযোগ করতে ২৫টি সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুতই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button