Hot

ভোটের অপেক্ষায় মানুষ, আগ্রহ নেই পিআরে

গাজীপুর জেলার উত্তরের সীমান্তবর্তী থানা শ্রীপুর। উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বে তেলিহাটি ইউনিয়নের আনসার টেপিরবাড়ি বাজার। সকাল ১১টায় বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়লো টিনের চালার নিচে চায়ের দোকান। বেড়াহীন দোকানটির চারপাশে বেঞ্চে বসে আছেন জনাদশেক লোক। কারও হাতে চায়ের পেয়ালা, কারও হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। গল্প করছেন দেশের সমসাময়িক নানা বিষয়ে। তাদের আড্ডায় যোগ দিতেই উঠলো ভোটের প্রসঙ্গ। চায়ের কাপ হাতে আশি বছরের শামসুদ্দিন মৃধা। সাবেক আনসার কমান্ডারের জন্ম বৃটিশ পিরিয়ডে। গায়ের চামড়া কুঁচকে গেলেও ভোট নিয়ে তার মন্তব্য প্রখর। দেশের ভোট নিয়ে তিনি বলেন, গত তিন টার্ম মানুষের ভোটের প্রয়োজন পড়েনি। তাই মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। ৫ তারিখের পর দেশে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

সবার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস কাজ করছে- এবার কেউ জোর করে ভোট কেটে নেবে না। যার ভোট সেই দিতে পারবে। তবে আড্ডার মাঝেই তার মনের আক্ষেপ উগড়ে দেন। বলেন, এত সরকার আসলো- গেল কেউই দেশ নিয়ে ভাবে নাই। যেই ক্ষমতায় আসছে টাকা লুট করেছে আর বিদেশে পাচার করেছে। তারা যদি দেশ নিয়ে ভাবতো তাহলে এই করুণ পরিস্থিতি হতো না। দেশটা অনেক উন্নত হয়ে যেত। একই আড্ডায় বসে ছিলেন সত্তুরোর্ধ আবদুল কাদির। মাথার চুল-দাঁড়ি শ্বেত-শুভ্র। আড্ডায় সুর মেলান তিনিও। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখি, আমার ভোট আরেকজন দিয়ে দিয়েছে। এসব ভাঁওতাবাজির নির্বাচনের কারণে মানুষ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। জোর করে মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিতে পারতো না। কারণ তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তার ভোট না দিলেও সরকার যাকে পাস করাবে সেই জয়লাভ করবে। কিন্তু এবার আর তা হবে না। এ ধরনের ভাঁওতাবাজির চেষ্টা করলে ভোটকেন্দ্রে মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। অনেকদিন ধরে ভোট দিতে না পারার কারণে আমার এলাকার মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। সব বয়সের মানুষ ভোট কেন্দ্রে যাবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই বিপুল উপস্থিতি দেখা যাবে। পঞ্চাশোর্ধ মো. হাফিজ একজন আড্ডারতদের প্রশ্ন রাখেন- আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচন করতে না পারে  তাহলে তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা কাকে ভোট দেবে? তৎক্ষণাত পাশ থেকে অপর একজন জবাব দেন, ডাইহার্ট যারা আওয়ামী লীগ করেন তারা ভোটকেন্দ্রে যাবে না। আর যারা সমর্থক তারা হয়তো ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন। যে এলাকায় যিনি ভালো প্রার্থী তাকেই হয়তো তারা ভোট দিবেন। অপর একজন মন্তব্য করেন, আমরা যারা এতদিন ভোট যেতে আগ্রহ দেখাইনি তারাও হয়তো ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহ দেখাবে না।

টেপিরবাড়ি গ্রাম থেকে মাইল তিনেক উত্তরে দেওনাচালা গ্রাম। সরু পথ জুড়ে ইটের সলিং বিছানো। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি লিচু গাছ। পথের ধারে সবুজাচ্ছাদিত ধানের জমি। চোখ জুড়ানো গ্রামটিতে ঢুকতেই সড়কের পাশে টং দোকান। বয়োবৃদ্ধ আলতাফ হোসেন  দোকানটি চালান।  গ্রামের অলস মানুষেরা টং দোকানটিতে আড্ডা দিচ্ছেন। তারাও কিস্তিখেউড় আওড়াচ্ছেন। লিটন নামের একজন বলেন, আমি ভোট দিতাম আওয়ামী লীগকে। তবে গত কয়েকদফা ভোট দিতে যাইনি। কিন্তু এবার ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবো। আড্ডার আলোচনার একপর্যায়ে চলে আসে পিআর প্রসঙ্গ। পিআর নিয়ে আড্ডায় উপস্থিত সবাই একযোগে অনীহা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, আমার ভোটটা কোথায় যাচ্ছে আমি বলতে পারবো না। পিআর হলে ভোট না দেয়াই ভালো। তখন চা-দোকান মালিক আলতাফ পিআর পদ্ধতি নিয়ে একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ধরেন আমার কাছে একজন ৫টা চায়ের অগ্রিম অর্ডার দিয়েছেন, আরেকজন ৩টা চায়ের অগ্রিম অর্ডার দিয়েছেন, আর যারা নগদ অর্ডার দিচ্ছেন তাদের দিতে পারবো না। কিন্তু যারা অগ্রিম অর্ডার দিয়েছেন তাদেরকেই দিতে হবে।  তাই এই সিস্টেম হলে ভোটের কোনো দাম থাকবে না। মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে না ভোট দিতে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে দল যাকে মনে করবে তাকেই সংসদে এমপি বানাতে পারবে। তাই এই সিস্টেম না হওয়াই ভালো।

বিকালে শ্রীপুরের কেওয়া গ্রামের ভেতরে টং দোকানে দেখা মেলে আরেক চায়ের আড্ডার। বিভিন্ন বয়সী ৫ জন আড্ডার আলোচক। চায়ের দোকানের টিভি দেখাকে কেন্দ্র করে এই আড্ডা। সেখানে রাজনৈতিক আলোচনার একপর্যায়ে বিভিন্ন ইসলামী দলের পিআর পদ্ধতির দাবির সমালোচনা করেন হাবিব নামে একজন। তিনি বলেন, গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের পড়াশোনা কম। পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে তারা পরিচিত নয়। তাই এই পদ্ধতিতে ভোট হলে মানুষের মধ্যে আগ্রহ কমে যাবে। গ্রামের মানুষ এটা গ্রহণ করবে। হাবিবের মন্তব্যে সুর মেলান উপস্থিত অন্যরা।

গ্রামে বাজারে, দোকানে আড্ডা দেয়া মানুষজনের অনেকের হাতে এখন স্মার্ট ফোন। ব্যবহার করেন ইন্টারনেটও। তারা ফেসবুক, ইউটিউবে আসা তথ্য পেয়ে যান মুহূর্তে। এসব তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি চলে। কেওয়া বাজারে আড্ডা দেয়া একজন বলছিলেন, মানুষ এখন আগের অবস্থায় নেই। প্রতি মুহূর্তের খবর, তথ্য পেয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ মনে করছে, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচনটা হয়ে গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর না হলে সমস্যা আরও বাড়বে। 
গাজীপুর-৩ আসনে অবস্থিত উপজেলাটি শিল্প অধ্যুষিত এলাকা। ভোটার রয়েছে প্রায় ৫ লাখ। শিল্প-অধ্যুষিত এলাকা হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। রয়েছে লিচু-কাঁঠালের বাগান। প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ সড়কও পাকা। অসংখ্য শিল্প কলকারখানা থাকায় বিভিন্ন জেলার মানুষ এখানে বসবাস করেন। ৫ই আগস্টের পর দৃশ্যত মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। নির্বাচনী এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থীর বিষয়ে এখনো  কোনো সিগন্যাল আসেনি কেন্দ্র থেকে। ধানের শীষের মনোনয়ন লড়াইয়ে মাঠে রয়েছেন অন্তত ৫ জন বিএনপি নেতা। উপজেলা জুড়ে ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটানোর পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করছেন তারা। তবে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে আগেই। এই প্রার্থীর পক্ষে এলাকায় প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।  ৫ই আগস্টের পর এই এলাকায় রাজনৈতিক হানাহানি, মামলা বাণিজ্যের ঘটনাও ঘটেছে। বেড়েছে খুনোখুনিও। ৫ই আগস্টের পর অন্তত দুই ডজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button