International

শব্দভেদী বানের গল্প ছাড়িয়ে ইরানের কাসেম বাসির ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত লক্ষ্যভেদ

‘কাসেম বাসির’ নামের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১২০০ কিলোমিটারেরও বেশি, আর এর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা এক মিটারেরও কম। বিশেষজ্ঞরা একে এখন পর্যন্ত ইরানের সর্বাধিক নির্ভুল প্রতিরক্ষা সাফল্য বলে মনে করছেন।

লোককথায় একটি তুলনা আছে- ‘শব্দভেদী বান’। কান খাড়া করে শোনা যায়, কিভাবে বনের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সেই বান লক্ষ্যভেদ করে ছুটে যায়। কিন্তু আধুনিক যুগে ইরানের তৈরি এক ক্ষেপণাস্ত্র যেন সেই গল্পকেও হার মানিয়েছে। শব্দভেদী বানের চেয়েও নিখুঁত, একবার লক্ষ্য ঠিক করলে ভুল হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। ইরানের অন্যতম জনপ্রিয় দৈনিক হামশাহরি অনলাইনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ গল্প।

কাসেম বাসির: লক্ষ্যভেদের অতুলনীয় নিখুঁততা

‘কাসেম বাসির’ নামের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১২০০ কিলোমিটারেরও বেশি, আর এর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা এক মিটারেরও কম। ক্ষেপণাস্ত্রটিতে আছে আধুনিক ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা, উন্নত তাপচিত্র (অপটিক্যাল) প্রযুক্তি এবং শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল প্রতিহত করার ক্ষমতা। বিশেষজ্ঞরা একে এখন পর্যন্ত ইরানের সর্বাধিক নির্ভুল প্রতিরক্ষা সাফল্য বলে মনে করছেন।

যুদ্ধের আগেই উন্মোচন

হামশাহরি অনলাইন জানায়, ইরানের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী-বিষয়ক মন্ত্রী ও বিমান বাহিনীর সাবেক পাইলট কমান্ডার আজিজ নাসিরজাদে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আমরা কাসেম বাসির ক্ষেপণাস্ত্রের উন্মোচন করি। এটি আমাদের সবচেয়ে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র, যা আমরা যুদ্ধে ব্যবহার করিনি।’ গত ৪ মে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন থেকে কাসেম বাসির ক্ষেপণাস্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়।

প্রযুক্তির ভেতরের কাহিনি

এই ক্ষেপণাস্ত্র এমনভাবে তৈরি যে এর লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা একে এমন এক বুদ্ধিমান অস্ত্র বলছেন, যা শুধু লক্ষ্য চিনতেই পারে না, বরং অনেকগুলো ভুয়া লক্ষ্য থেকেও আসল লক্ষ্য আলাদা করতে পারে।

ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার নকশা করার সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞানীরা জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করেননি। ফলে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সময়ও ক্ষেপণাস্ত্রের পথ হারানোর আশঙ্কা নেই। এর উন্নত চালচলন ক্ষমতার কারণে এটি সহজেই শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে। পরীক্ষামূলক প্রয়োগেও দেখা গেছে, তীব্র ইলেকট্রনিক জ্যামিং-এর মধ্যেও কাসেম বাসির কার্যকর। অর্থাৎ শত্রুপক্ষ যতই প্রযুক্তিগত বাধা সৃষ্টি করুক, এর লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা অটুট থাকে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ধারাবাহিকতা

কাসেম বাসির শুধু একটি অস্ত্র নয়, বরং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির নতুন যুগের প্রতীক। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিরক্ষা ক্ষমতাকে নিজের শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ১২ দিনের পবিত্র প্রতিরক্ষার সময়ে এই কৌশলগত সক্ষমতার কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরানের হাতে এখন নানা পাল্লা ও ক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে- খোররামশাহর, কাদর, ইমাদ, কিয়াম, খাইবার-শেকান, হাজ কাসেম, সজ্জিল, পাভেহ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ আরও বহু ধরনের উন্নত অস্ত্র।

স্বনির্ভরতার গল্প

আজিজ নাসিরজাদে জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ৯০ শতাংশেরও বেশি দেশেই উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র খাতে কঠিন জ্বালানি ও তরল জ্বালানি- উভয় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শতভাগ দেশীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে। কোনো বিদেশী প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীলতা নেই বললেই চলে।

শেষ কথা

কাসেম বাসির ক্ষেপণাস্ত্র প্রমাণ করে দিয়েছে, ইরান শুধু প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নয়, বরং চৌকস বা স্মার্ট অস্ত্র প্রযুক্তিতেও বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে পৌঁছে গেছে। এক সময় লোককথার শব্দভেদী বানের মতোই কল্পনায় মনে হতো এমন নিখুঁত লক্ষ্যভেদ সম্ভব কি-না। কিন্তু ইরানের বিজ্ঞানীরা সেটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন- একেবারে এক মিটারেরও কম ভুলের সম্ভাবনা নিয়ে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button