জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, কে দেবে গ্যারান্টি?

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক, টানা ৬৮ দিনের আলোচনার পরও সংকটে পড়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১৯টি বিষয়ে ঐকমত্য হলেও, সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভাজন। নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারই কি সনদকে আইনি কাঠামো দেবেন, নাকি তা নির্বাচিত সংসদের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে এই প্রশ্নে জটিলতা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। বিএনপি বলছে, সনদ কেবল প্রস্তাব হিসেবে থেকে যাক, আইনি ভিত্তি দেবে ভবিষ্যৎ সংসদ। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল জোর দিয়ে বলছে, নির্বাচনের আগেই আইনি ভিত্তি না পেলে জুলাই সনদ কেবল কাগুজে দলিল হয়েই থাকবে। কে দেবে বাস্তবায়নের গ্যারান্টি- এই প্রশ্নে অনিশ্চয়তা এখন আরও প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) আলোচনায়ও শিক্ষাবিদ, সচেতন নাগরিকরা সনদের ভাবনায় এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টের ভবিষ্যৎ কী হবে? নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে অথবা নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া কীভাবে সরকার এটা বাস্তবায়ন করবেন। এ বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের কাছে স্পষ্ট রূপরেখা দাবি করেছেন তারা।
সুজন জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলায় ১৫টি নাগরিক সংলাপ ও বিস্তৃত জনমত জরিপের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সনদের খসড়া তৈরি হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে ২০২৫ সালের জুলাই সংস্করণটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে মোট ৯৫টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৮৪টিতে সর্বসম্মত সমর্থন মিলেছে এবং ১১টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সংলাপে প্রস্তাবিত সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়। সুজনের পক্ষ থেকে চারটি বিকল্প পথ প্রস্তাব করা হয়, সংবিধান সংশোধন, গণভোট, রাষ্ট্রপতির প্রোক্লেমেশন এবং নতুন করে গণপরিষদ গঠন। যেকোনো সনদের সাফল্য নির্ভর করে তার বাস্তবায়নের ওপর।
ঐকমত্য কমিশন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। কার্যকর উপায় গণভোট বা বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের অভিপ্রায়কে ভিত্তি করে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করা সম্ভব, আবার ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে গণভোটের মাধ্যমেও বৈধতা দেয়া যায়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, তিনটি প্রস্তাব একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান খুঁজতে হবে। আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো একটি আইনসম্মত ও বাস্তবসম্মত পথ বের করবে।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই সনদ অঙ্গীকারনামার কিছু বিষয় অযৌক্তিক মনে করেছে বিএনপি। বিকল্প প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার সময় দেয়া হবে। সংবিধানের ওপরে স্থান পায় এমন কোনো বিষয় গ্রহণযোগ্য হবে না। আলোচনার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একটি অবস্থানে পৌঁছাবে বলে প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, সংস্কারের জন্য যে সাংবিধানিক সংস্কার আনতে চাই সেগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্ভব। বিধানগুলো আজকেই বহাল হলে কিছু বিষয় সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিধানগুলো সংসদ নির্বাচনের পর বাস্তবায়ন করা যাবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান মানবজমিনকে বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির ব্যাপারে আমাদের দৃঢ় অবস্থান। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সনদে যে ঘাটতিগুলো আছে- ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হবে। শুধু কাগজে স্বাক্ষর করলে হবে না। এই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সনদকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে জুলাই সনদকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবেন- এর গ্যারান্টি কে দেবে? জুলাই সনদ শুধু দলিল আকারে থাকলে, এতদিনের শ্রম বৃথা যাবে। বাস্তবায়নের স্পষ্ট পথ এবং আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে এই সরকারকে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্বাচনের আগে কোনগুলো বাস্তবায়ন করবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা দিতে হবে।
কমিশনের হাতে সময় আছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে দলগুলোকে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করানো এবং বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ দেখানোই কমিশনের প্রধান কাজ। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তৃতীয় দফায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ জানানো হবে দলগুলোকে। সঙ্গে সকল রাজনৈতিক দল মিলে এতদিনের অর্জনের একটি পথ বের করা যাবে বলে জানিয়েছে ঐকমত্য কমিশন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কমিশনের সামনে এখন মূল প্রশ্ন- কীভাবে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি তৈরি হবে এবং কে সেই সনদ বাস্তবায়নের গ্যারান্টি দেবে। নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নের সমাধান না হলে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন তারা।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সময় যতই এগিয়ে আসছে, কমিশনের ওপর ততই চাপ বাড়ছে। ১৫ই সেপ্টেম্বর শেষ হচ্ছে কমিশনের মেয়াদ। তবে কমিশন সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জুলাই সনদকে কার্যকর রূপ দিতে হলে মেয়াদ আবারো বাড়ানো হতে পারে।
উল্লেখ্য, জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় তিনটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশের পটভূমিতে ৫টি প্রস্তাবনা, দ্বিতীয় অংশে ঐকমত্য হওয়া ৮৪টি সিদ্ধান্ত এবং তৃতীয় অংশে রয়েছে ৮টি অঙ্গীকার। আবার ঐকমত্য হওয়া ৮৪টির মধ্যে ১৪টিতে নোট অব ডিসেন্টও (ভিন্নমত) রয়েছে।