International

আড়াই দশকের ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ২৫ ঘণ্টায় ভেঙে যাচ্ছে!

মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব ফোরামের সভাপতি এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকেশ আঘি বলেছেন, ‘আমরা এখন এমন একটি পরিস্থিতিতে আছি যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের উপর সম্পূর্ণরূপে বিরক্ত এবং সম্পর্ক গড়ে তোলার ২৫ বছরের প্রচেষ্টা ২৫ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে। চরম উৎকণ্ঠার সাথে মুকেশ আঘি এও বলেছেন, ‘আমাদের এটিকে (ভারত-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি) কোনোভাবে আটকাতে হবে… কারণ সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনৈতিক সাময়িকি পলিটিকোর এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ট্রাম্প কেন ভারতের সাথে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করলেন। এর একটিই কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের ওপর সম্পূর্ণরূপে বিরক্ত। ফলে ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক বাণিজ্য গতিশীলতার বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব তৈরির অনিশ্চিত প্রকৃতির ইঙ্গিত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম দিকে হোয়াইট হাউস সফরের ফলে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা শুরু হয়েছিল। জুলাইয়ের মধ্যে, ভারতীয়রা বিশ্বাস করেছিল যে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে এবং বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক ও মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার কেবল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কখনো আসেনি।

পরিবর্তে, ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং তারপর রুশ তেল কিনতে নিরুৎসাহিত করার জন্য অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ফলে ভারতীয় পণ্যগুলো এখন ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সম্মুখীন হচ্ছে। নয়াদিল্লি এবং মস্কোর উপর এটি ভীষণ আঘাত।

বাণিজ্য সংঘাতের এ নমুনা ভারত এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলোকে রাশিয়া এবং চীনের আরো কাছে ঠেলে দেয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতটা চ্যালেঞ্জিং অবস্থানে রয়েছে তাও তুলে ধরে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বৃহস্পতিবার মোদির সাথে কথা বলেছেন, তার আগে লুলা ব্রিকস উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কাছ থেকে ট্রাম্পের শুল্কের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানান।

কয়েক মাস ধরে মনে হচ্ছিল হোয়াইট হাউস ভারতের সাথে একটি চুক্তি ঘোষণা করতে প্রস্তুত। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ভারতীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত ছিলেন যে একটি প্রাথমিক চুক্তি কেবল ট্রাম্পের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন যে ভারতের সাথে একটি চুক্তি আসন্ন। ট্রাম্প জুলাইয়ের মাঝামাঝি বলেন, “আমরা ভারতের খুব কাছাকাছি, এবং … আমরা সম্ভবত (ইইউ) এর সাথে একটি চুক্তি করতে পারি।”

কিন্তু তার মনোযোগ দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে চলে যায়, যখন ভারতের সাথে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার মতে, বিশ্বের সর্বোচ্চ শুল্কের মধ্যে কয়েকটিতে থাকা ভারত, তার বাণিজ্য বাধাগুলোর অনেকগুলো হ্রাস করতে সম্মত হয়েছে, তবে সবগুলো নয়। কিন্তু ট্রাম্প যখন ভারতের প্রস্তাবটি দেখেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে এটি সম্পূর্ণরূপে অপর্যাপ্ত।

এদিকে, ভারতীয়রা বিশ্বাস করেছিল যে মোদি এবং ট্রাম্প সরাসরি বৈঠক বা ফোন কলে কথা বলতে পারলে দুই দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে। এটি কখনো ঘটেনি, কারণ ভারতের বিরোধী দলের চাপের মুখে মোদি নিজেকে ট্রাম্পের প্রকাশ্যে নিন্দা করার মতো অবস্থানে রাখতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতাদের সাথে যোগাযোগ ছাড়াই জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে চুক্তি করেছে।

মুকেশ আঘি বলেন, মোদি নিজেকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং যদি তার নিন্দা করা হয়, তাহলে তিনি পাল্টা আঘাত করেন। তাই সম্ভবত তিনি সেই অবস্থানে যেতে চান না, বলেই ট্রাম্পের সাথে মোদির ফোন এড়ানোর মূল কারণ।

এর আগে, ট্রাম্প, যিনি ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার অব্যাহত আক্রমণের কারণে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েছেন, রুশ তেল ক্রয়ের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের জন্য ভারতকে এককভাবে নির্দেশ করেছিলেন। ভারত গত বছর ৫২.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রুশ তেল কিনেছিল, যার কিছু অংশ পরে পরিশোধিত করে ইউরোপে পাঠিয়েছিল।

ভারতের যুক্তি রুশ তেল ক্রয় কেবল তার নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য এবং অভিযোগ করেছে যে এটিকে এককভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু রুশ প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম ক্রেতা ইইউ এবং রুশ কয়লার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা যে তুরস্ক তা ট্রাম্প প্রশাসনের নজর এড়ায়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, ‘এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, অন্যান্য দেশও তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার জন্য আমেরিকা ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে বাধ্য হচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার তেল কেনার কারণে অন্যান্য দেশও শিগগিরই একই ধরনের তথাকথিত দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারে। তিনি বলেন, ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করার পর “মাত্র আট ঘণ্টা হয়েছে,” “আপনি আরো অনেক কিছু দেখতে পাবেন।”

তবুও, আগামী ২৭ আগস্টের নতুন সময়সীমার আগে ভারত আশা করছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার বাণিজ্য আলোচনা শেষ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। মুকেশ আঘি এখনো আশাবাদী হয়ে বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী মোদির সমালোচনা করেননি। তিনি সর্বদা বলেছেন যে, তিনি আমার বন্ধু, এবং এখনো পর্যন্ত সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমালোচনা আসেনি। তাই আমি মনে করি হয়তো একটা পরিবর্তন আসতে পারে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button