Bangladesh

দ্রব্যমূল্য নিয়ে আওয়ামী লীগ বিব্রত ও হতাশ, ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই বিব্রত ছিল ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টিকে ‘সর্Ÿোচ্চ অগ্রাধিকার’ দিয়েছে দলটি। তবে এখনও কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নিতে পারায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা এ নিয়ে এখন শুধু বিব্রতই না, বরং হতাশ। দলের তৃণমূলের কেউ কেউ ক্ষুব্ধও। গত ৭ জানুয়ারী নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর সরকারের মন্ত্রীরা দ্রব্য মূল্য ও মূল্য বৃদ্ধিকারী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে লাগাতার কথা বললেও এখনো দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন দেখা যায় নি। আর এ নিয়েই আওয়ামী লীগে রয়েছে হতাশা। আর তৃণমূল নেতারা বিষয়টিকে দূরভাগ্যজনক বলে আখ্যায়িত করছেন। ফলে এখন দ্রব্যমূল্যের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সামাজিক পদক্ষেপ জরুরী হয়ে পরেছে বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা মনে করছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে অনেক আগে থেকেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য বলা হচ্ছে, ইউক্রেন- রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধই কারণ। এর আগে নির্বাচনের আগেই এক সংবাদ সম্মেলনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত মাসে অপর এক সংবাদ সম্মেলনে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিন্ডিকেট করে ‘মজুতকারীদের’ গণধোলাই দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ডিম লুকিয়ে রেখে দাম বাড়ানোর কথা তো আপনিই বললেন। আপনার কি মনে হয় না, যারা সরকার উৎখাতে আন্দোলন করে তাদেরও এখানে কারসাজি আছে? এর আগে দেখলাম পেঁয়াজের খুব অভাব। পরে দেখা গেল বস্তা বস্তা পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছে। এ লোকগুলোকে কী করা উচিত, সেটা আপনারাই বলেন। এদের তো গণধোলাই দেওয়া উচিত। কারণ আমরা সরকার কিছু করলে বলবে, সরকার করেছে। পাবলিক যদি প্রতিকার করে, তাহলে সব চেয়ে ভালো, কেউ কিছু বলবে না।

১লা মার্চ থেকে বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসবে বলে গত মাসে জানিয়েছিলেন সরকারের বানিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। এর আগে থেকে দফায় দফায় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। গত ১৪ই ফেব্রুয়ারী তিনি বলেছিলেন, আমরা একযোগে বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে চাচ্ছি। আগামী ১ মার্চ থেকে এ পরিবর্তন দেখবে দেশ। ভোক্তা থেকে উৎপাদক পর্যায়ে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পলিসি বা ভোক্তা অধিদপ্তর দিয়ে কোনো হ্যারাজমেন্ট (হয়রানি) নয় বরং সাপ্লাই (সরবরাহ) যথেষ্ট রাখা হবে। পাশাপাশি চালের বস্তায় উৎপাদন বছর, তারিখ, উৎপাদন মূল্য, পাইকারি মূল্য ও খুচরা মূল্য লেখা লেবেল থাকবে।

তবে গতকাল বানিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, রমজানের আগে ভোক্তাদের যেন বাড়তি দামে পণ্য কিনতে না হয়, সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এতে নিত্যপণ্যের দাম যৌক্তিকভাবে কমে আসবে। নিত্যপণ্য নিয়ে ব্যবসায়ী বা অন্য কারো কাছে সরকার জিম্মি থাকবে না। পণ্য আমদানি ও খালাস করা নিয়ে যৌক্তিক কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো অজুহাত সহ্য করা হবে না। রমজান ও রমজানের বাইরে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা কারও কাছে জিম্মি থাকবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের পর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দ্রব্যমূল্য নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে বিষয়টিকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছে তেমনি নেতাদের মধ্যেও এ বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের এক সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য। তবে যেহেতু বিষয়টি এখনো সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে সে জন্য বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা তেমন কিছু করছেন না।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ফোরামেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ে হতাশাও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। আর দলের তৃণমূল থেকে বিষয়টি নিয়ে পাওয়া গিয়েছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিষয়টি নিয়ে সরকার থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়েছে নির্বাচনের পর থেকে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিষয়টিকে সরকারের জন্য সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে কোন দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায় নি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উদ্বেগজনকভাবে টানা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা সাধারণ মানুষের কাছেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি দেশের প্রতিটি মহলে সমালোচিত হচ্ছে অনেক আগে থেকে। এমন অবস্থায় যে সকল মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে বেশ কথা বলছেন তাদেরই দায়ী করেছেন দলটির কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কেউ কেউ হতাশার সঙ্গে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের এক তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে তো সরকার অনেক আগে থেকেই কাজ করছে। কিন্তু এত সময় কিন্তু লাগার কথা নয়। আমরা দলের তৃণমূল নেতা আমাদের অনেকেরই ইনকাম বাড়ে নি। আর বিষয়টি নিয়ে জনগণ অনেক কষ্টের মধ্যে আছে, তাদের কাছেও আমরা যারা দল করি তাদের বিব্রত হতে হচ্ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকার যেন আরো সতর্ক হয়।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের এক জেলার সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, এটা আমাদের দূরভাগ্য বলা যায়। কারণ আমরা কেউ মানবিক নেই। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের দু:খ কষ্টের শেষ নেই। আসলে এ বিষয়টি নিয়ে আরো অনেক বেশি সরকারী পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, সরকার যদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সিন্ডিকেট কিংবা মজুরদারদের দমন না করা গেলে এ সমস্যা থেকে সহজে মুক্তি মিলবে না। অবশ্যই এর জন্য সরকারকে যথেষ্ট কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে শুধু বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি পণ্য মজুতকারীদের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। সরকার যখন কঠোর পদক্ষেপ শুরু করবে এবং সেই সব অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে চেষ্টা করবেন তখন জনগণও সরকারের পক্ষে থাকবে। প্রয়োজনে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ঠেকাতে হবে বলেও আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন।

দ্রব্যমূল্য নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, যে সব মন্ত্রীরা বেশি কথা বলেন তারা সে অনুযায় কাজ করতে পারছেন না। কাজ করতে পারলে তো এই অবস্থা হয় না। আমি এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, যারা এসব কথা বলেছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন। নিয়ন্ত্রন কেন হচ্ছে না, এ বিষয়ে তারা উত্তর দিতে পারবেন। আমি এই বিষয় বলতে পারব না।

দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের পাশাপাশি দলের কোন কোন করণীয় রয়েছে কী না জানতে চাইলে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলের সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগেরই তো সরকার। দ্রব্যমূল্য যখন বৃদ্ধি পায় তখন তো মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়। তিনি বলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার সিন্ডিকেটের কারণে মানুষ কষ্টে যে আছে এটা সত্য। যখন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেই কিন্তু যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় এটা অনৈতিক। যারা এমন ঘটনার জন্য দায়ী তাদের আইনের আত্তত্বায় এসে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। শুধু মনিটরিং নয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তবে ব্যবসায়ীদের ধরপাকড় করেও ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

Show More

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button