Bangladesh

সুসেন নাম দিয়ে নেওয়া হলো সুমিতের কিডনি, ভাই ও স্ত্রী জানলেন টেলিভিশন দেখে

সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল

  • টেলিভিশনে খবর দেখে কিডনিদাতার ভাই ও স্ত্রী হাসপাতালে যান।
  • মিথ্যা পরিচয়ের কথা স্বীকার করেছেন কিডনিগ্রহীতার ছেলে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপনে অনিয়ম এবং দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিডনিদাতা ও কিডনিগ্রহীতার মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে।

কিডনিগ্রহীতার ছেলে ও কিডনিদাতার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে গত সোমবার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এটি ছিল নতুন এই হাসপাতালের প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন। প্রযুক্তিনির্ভর অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা দিতে ‘সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। ব্যয় হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর এই হাসপাতালের উদ্বোধন করেন।

হাসপাতালটির প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে অংশগ্রহণ করেন ১৫ জন চিকিৎসক। এর নেতৃত্ব দেন কিডনি বিভাগের রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। সোমবার বিএসএমএমইউ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, পিরোজপুরের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী সুজন রায় কিডনি গ্রহণ করেছেন। আর কিডনি দিয়েছেন তাঁর ছোট ভাই ৩১ বছর বয়সী সুসেন রায়।

গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে কিডনি নেওয়া হয়েছে এক ব্যক্তির। দালালদের সঙ্গে তিন লাখ টাকার চুক্তি।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে একটি জানায়, কিডনিদাতা সুসেন রায় নন। দাতা ও গ্রহীতা সম্পর্কে ভাই না। কিডনিদাতাকে গ্রিস পাঠানো হবে—এই প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিনিময়ে কিডনি নেওয়া হয়েছে। দেশের বর্তমান আইনে আপন ভাইকে কিডনি দেওয়া যায়। আইনানুগ নিকটাত্মীয় ছাড়া কারও কিডনি নেওয়া যায় না।

গতকাল বিকেলে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, কিডনিদাতা চতুর্থ তলায় আইসিইউতে আছেন। কিডনিগ্রহীতা সাততলার পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের (অস্ত্রোপচার–পরবর্তী ওয়ার্ড) আইসিইউতে রয়েছেন।

সুমিত দুই দিন আগে বাসা থেকে বেরিয়েছেন। বের হওয়ার আগে বলেছিলেন, বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে একটি প্রশিক্ষণের জন্য বরিশাল যাচ্ছেন। সুমিতের স্ত্রীও টেলিভিশন থেকে কিডনি দানের ঘটনাটি জানতে পারেন।

সুমিতের স্ত্রী

খবর দেখে হাসপাতালে

বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে সোমবার ভাই ভাইকে কিডনি দিয়েছেন এমন খবর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়। খবরটি কিডনিদাতার স্ত্রী ও তাঁর ভাইয়ের চোখে পড়ে। তাঁরা প্রকৃত ঘটনা জানতে গতকাল হাসপাতালে আসেন। তাঁদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের দেখা ও কথা হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিডনিদাতার প্রকৃত নাম সুমিত হাওলাদার। তাঁর ভাই অমিত হাওলাদার। তাঁরা যমজ ভাই। তাঁদের বাড়ি ঝালকাঠি।

অমিত হাওলাদার বলেন, তিনি সুমিতের কয়েক মিনিটের বড়। সোমবার রাতে তিনি টেলিভিশনে ভাইয়ের কিডনি দানের খবর দেখে অবাক হন। ছবিতে তিনি ভাইকে চিনেছেন। খবরে ছবি ঠিক থাকলেও ভাইয়ের নাম ঠিক ছিল না।

অমিত টঙ্গীতে একটি কারখানায় কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই সুমিতের স্ত্রী। সুমিতের স্ত্রী রাজধানীর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নার্স। সুমিত স্ত্রীকে নিয়ে ফার্মগেট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

সুমিতের স্ত্রী বলেন, সুমিত দুই দিন আগে বাসা থেকে বেরিয়েছেন। বের হওয়ার আগে বলেছিলেন, বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে একটি প্রশিক্ষণের জন্য বরিশাল যাচ্ছেন। সুমিতের স্ত্রীও টেলিভিশন থেকে কিডনি দানের ঘটনাটি জানতে পারেন।

অমিত, সুমিতের স্ত্রী এবং আরও দুজন আত্মীয় গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ছিলেন।

‘ঘটনাটি আপনার মুখে শুনে আমি অবাক হচ্ছি। ঠিক কী ঘটেছে, তা জেনে আমি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।’

মো. শারফুদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক

দালালরা নিয়েছেন তিন লাখ

সপ্তম তলায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন কিডনিগ্রহীতা সুজন রায়। তাঁকে দেখভাল করেন তাঁর ছেলে সাগর রায়। গতকাল সন্ধ্যায় সাততলায় গিয়ে প্রথমে সাগর রায়কে পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা খোঁজাখুঁজির পর সাগর আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছয়জন শিক্ষার্থী, যাঁরা তাঁর বন্ধু পরিচয় দেন। তাঁদের সবার সামনে সাগরের সঙ্গে কিডনি প্রতিস্থাপন নিয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয়।

সাগর বলেন, তাঁর বাবা ১১-১২ বছর গ্রিসে ছিলেন। ওই দেশে থাকতেই তাঁর কিডনি রোগ শনাক্ত হয়। সেখানে চিকিৎসা ও কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যয় অনেক বেশি। এ কারণে তিনি দেশে এসে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গত ডিসেম্বরে দেশে আসেন।

সাগর বলেন, কয়েক মাস ধরে বাবাকে নিয়ে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসার জন্য ঘোরাঘুরি করছেন তিনি। কিডনিদাতা সুসেন (প্রকৃত নাম সুমিত) তাঁর আপন কাকা। কাকার স্ত্রীর সঙ্গে কবে শেষ কথা বা দেখা হয়েছে জানতে চাইলে সাগর বলেন, তিনি তাঁর কাকার স্ত্রীকে কখনো দেখেননি। কারণ, তাঁরা সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। তিনি কখনো কাকার বাসায়ও যাননি।

কিডনিদাতা তাঁর আপন কাকা নন—এই তথ্য এই প্রতিবেদক জানেন এবং প্রমাণ আছে, এমন কথা শোনার পর হকচকিয়ে যান সাগর। একপর্যায়ে স্বীকার করেন কিডনিদাতা তাঁর কাকা নন।

সাগর বলেন, বিএসএমএমইউতে রণজিৎ ও কলিঙ্গ নামের দুজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁরা কিডনি কেনার ব্যাপারে সহায়তার আশ্বাস দেন। তাঁদের সঙ্গে তিন লাখ টাকার চুক্তি হয়। ওই দুই ব্যক্তি গত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁর বাবার বহু রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন।

কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁরা তৈরি করে দিয়েছেন। একাধিক সম্ভাব্য কিডনিদাতার ছবি দেখিয়েছেন। তাঁর মধ্যে বর্তমান দাতাও ছিলেন। তবে সুমিত হাওলাদারকে কোনো অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তাঁরা দেননি। তবে সুমিতকে গ্রিসে পাঠানোর সব ব্যবস্থা তাঁরা করবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন।

বিএসএমএমইউর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কিডনি কেনাবেচা চক্রের সম্পর্কের অভিযোগ আগেও ছিল। মামলাও হয়েছে। অন্যদিকে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া জোড়াতালি দিয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালুর চেষ্টা করেছে বর্তমান প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো না কোনো পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং সম্পর্ক লুকিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করানো সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঘটনাটি আপনার মুখে শুনে আমি অবাক হচ্ছি। ঠিক কী ঘটেছে, তা জেনে আমি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।’

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button