USA

মার্কিন সিনেট কেন ভেনিজুয়েলায় আক্রমণের জন্য ট্রাম্পকে সবুজ সঙ্কেত দিলো?

মার্কিন সিনেট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ৫১ ভোটে প্রত্যাখ্যান করেছে।

মার্কিন সিনেট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ৫১ ভোটে প্রত্যাখ্যান করেছে; এমন একটি সিদ্ধান্ত যা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আইন প্রণয়ন তদারকি ছাড়াই কারাকাসের উপর সামরিক চাপ বাড়ানোর অনুমতি দেবে।

কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া আক্রমণ নিষিদ্ধ করার বিলটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তিন সিনেটর টিম কেইন এবং অ্যাডাম শিফ এবং রিপাবলিকান পার্টির র‍্যান্ড পল উত্থাপন করেছিলেন। তারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই দেশকে সামরিক সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারেন। তবে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা তাদের বিরোধিতা করে ট্রাম্পের জন্য পথ খোলা রেখেছে।

এই প্রস্তাবটি এমন সময় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, যখন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে জাহাজ, ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং গোয়েন্দা বিমান মোতায়েনের পাশাপাশি দূরপাল্লার বোমারু বিমানের উড্ডয়ন ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে সীমিত আক্রমণ বা এমনকি স্থল অভিযানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ভেনিজুয়েলার প্রতি মার্কিন শত্রুতা হঠাৎ কোনো বিষয় নয়। বরং এটি ল্যাটিন আমেরিকার স্বাধীন সরকারগুলোর সাথে ওয়াশিংটনের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের অংশ। বিশেষ করে হুগো শ্যাভেজের সময় থেকে এবং তারপরে নিকোলাস মাদুরোর সময় থেকে, ভেনিজুয়েলা একটি আধিপত্য-বিরোধী দেশের প্রতীক এবং তারা এই অঞ্চল ও বিশ্বে মার্কিন নীতির বিরোধী; এমনকি ওয়াশিংটন এটিকে ল্যাটিন আমেরিকায় তার ঐতিহাসিক প্রভাবের জন্য হুমকি বলে মনে করে এবং সর্বদা ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক নীতি পোষণ করে।

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে এই আক্রমণাত্মক নীতি আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। তিনি বারবার হুমকি দিয়েছিলেন, ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক বিকল্পটি বিবেচনার টেবিলে রয়েছে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে তিনি কেবল অর্থনৈতিক চাপ এবং মাদুরোর বিরোধীদের সমর্থনের কথা বলেছিলেন। তবে নতুন ঘটনাবলী থেকে বোঝা যে তার সরকার মৌখিক হুমকির পর্যায় অতিক্রম করে এখন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনী মোতায়েন কেবল একটি প্রতীকী কাজ নয়, বরং ভেনিজুয়েলার মাটিতে অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুতিরও ইঙ্গিত।

এই ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির জন্য মার্কিন সরকারের নতুন অজুহাত হল মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই। ওয়াশিংটন কেবল এই অঞ্চলের সমুদ্র এবং আকাশ নিয়ন্ত্রণ করার কথাই ভাবছে না, বরং ভেনিজুয়েলার মাটির ভেতরে গোপন অভিযানের সম্ভাবনাও রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সিনেট প্রতিনিধিরা তাদের নেতিবাচক ভোটের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার কাছে এই বার্তা পাঠিয়েছেন, সামরিক অভিযান চালানোর জন্য ট্রাম্প এখন স্বাধীন এবং আইন প্রণেতাদের পক্ষ থেকে কোনো বিধিনিষেধ নেই। এমনকি মার্কিন বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও ঘোষণা করেছেন, সামরিক বাহিনী কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযান চালিয়ে যেতে পারে; অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যকরভাবে ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ নীতি ব্যবহার করছে।

হামলর জন্য ট্রাম্পকে অনুমতি দেয়া কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কৌশলগত সঙ্কেত। মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং ‘জেরাল্ড ফোর্ড’র মতো একটি বৃহৎ বিমানবাহী জাহাজের উপস্থিতি থেকে বোঝা যে ওয়াশিংটন যুদ্ধের পরিস্থিতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে।

বাস্তবতা হলো মার্কিন সরকার দু’টি সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছে, মাদুরোকে ভেতর থেকে উৎখাত করতে ব্যর্থতা এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ ব্যর্থ হয়েছে। তাই ট্রাম্পকে দেখাতে হবে যে তার হাতে এখনো আরো কঠোর হাতিয়ার রয়েছে। এই কারণে মাদক পাচারের বিষয়টি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে সামরিক শক্তি প্রয়োগে রূপান্তরিত করার জন্য একটি উপযুক্ত অজুহাত হিসেবে দেখছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ট্রাম্প জানেন যে সামরিক শক্তির ব্যবহার, এমনকি সীমিত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রচারণামূলক ফায়দা হাসিল করা যাবে। তিনি অতীতেও নির্বাচনী ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সামরিক পদক্ষেপ ব্যবহার করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ভেনিজুয়েলার প্রতি মার্কিন বৈরিতা এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে ‘অর্থনৈতিক চাপ’, ‘সামরিক চাপ’ এর সাথে মিলিত হয়েছে। নৌ অবরোধ, সিআইএ গোয়েন্দা অভিযান এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে বৃহৎ পরিসরে সামরিক মোতায়েন- এই সবকিছুই ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য আপাতত একটি ধ্রুপদী যুদ্ধে না গিয়ে মাদুরো শাসনের অবসান ঘটানো। কিন্তু সিনেটের ভোট ট্রাম্পকে প্রয়োজনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার অনুমতি দিয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত এবং উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।

প্রকৃতপক্ষে ওয়াশিংটন এখন একই সাথে তিনটি হাতিয়ার ব্যবহার করছে অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক অবরোধ এবং গোয়েন্দা অভিযান, যার সমন্বয় সাধারণত প্রতিপক্ষকে দমন করতে এবং সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য জনমত প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত হয়।

ওয়াশিংটনের মতে, যদি ভেতর থেকে মাদুরোর পতন না হয়, তবে তাকে বাইরে থেকে চাপের মাধ্যমে নতজানু করা হবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button