হৃদরোগ ক্যান্সার হয় জেনেও বহু তরুণ ধূমপান করে

তামাক কোম্পানিগুলো মুনাফা ছাড়া আর কিছু বুঝে না। জাতির ক্ষতি হয়ে গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। এরা কিছু দিন পরপরই নতুন কিছু নিয়ে ধূমপায়ীদের আকৃষ্ট করতে। এবার তরুণ-তরুণী ও বয়স্ক ধূমপায়ীকে আকৃষ্ট করতে তামাক কোম্পানিগুলো নিকোটিন পাউচ তৈরির কারখানা তৈরি করছে।
হৃদরোগ, ক্যান্সার, ফুসফুসের নানা রোগ হয় তা জানা থাকা সত্ত্বেও দেশের বিশালসংখ্যক তরুণ-তরুণী ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রয়োজন ধূমপানবিরোধী সরকারি ও বেসরকারি যেসব কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে তা আবার পর্যালোচনা করা এবং যেভাবে ধূমপায়ীরা ধূমপানের অপকারিতা বুঝতে পারে সে অনুযায়ী প্রচার চালানো। একটি সার্ভেতে দেশে ১৩ থেকে ১৫ বছরের ৯.২ শতাংশ ছেলে এবং ২.৮ শতাংশ মেয়ে ধূমপান করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ পাবলিক স্থানে এবং ৩১.১ শতাংশ বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। যদিও ধূমপায়ীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে তথাপি এখনো উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অনেক ধূমপায়ী রয়েছে দেশে। তামাক কোম্পানিগুলো থেকে সরকার প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও ধূমপানের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগ চিকিৎসায় দেশে ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক কোম্পানি থেকে নগদ কিছু টাকা রাজস্ব পেলেও স্বাস্থ্য খাতে এর চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়ে যাচ্ছে। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো বন্ধ করে দিলে সরকারের আট হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ সাশ্রয় হবে।
তামাক কোম্পানিগুলো মুনাফা ছাড়া আর কিছু বুঝে না। জাতির ক্ষতি হয়ে গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। এরা কিছু দিন পরপরই নতুন কিছু নিয়ে ধূমপায়ীদের আকৃষ্ট করতে। এবার তরুণ-তরুণী ও বয়স্ক ধূমপায়ীকে আকৃষ্ট করতে তামাক কোম্পানিগুলো নিকোটিন পাউচ তৈরির কারখানা তৈরি করছে। এই নিকোটিন পাইচ (তামাকের ব্যাগ) ধূমপানের নতুন উপকরণ পেয়ে এর স্বাদ নিতে আরো বেশি ধূমপায়ীরা আকৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ধূমপানে আরো বেশি খরচ হতে যাচ্ছে, এতে ব্যক্তিগতভাবে কল্যাণমূলক কাজে খরচ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ধূমপানের কারণে হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ নানা ধরনের অসংক্রামক রোগ হচ্ছে, এটা সবাই জানে। তথাপি ধূমপায়ীরা ধূমপান করে যাচ্ছে এবং সরকারও তামাক কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত করছে না, রাজস্ব গ্রহণ করে পরোক্ষভাবে তামাক কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করছে। হৃদরোগ, স্ট্রোক ও শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের অন্যতম কারণও তামাক। বর্তমানে দেশে প্রায় তিস কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করেন এবং প্রতি ১০ জনের মধ্যে চারজন পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। প্রতি বছর তামাকজনিত কারণে এক লাখ ৬১ হাজারেরও বেশি মানুষ অকালে মারা যায়। তরুণ প্রজন্মকে এই বিপদ থেকে রক্ষায় প্রস্তাবিত তামাক আইন সংশোধনী দ্রুত পাস করতে ধূমপানবিরোধী সংগঠনগুলো দাবি করেছে।
প্ল্যাটফর্ম ডক্টরস ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ডা: রামিসা ফারিহা বলেছেন, বিশ্বজুড়ে কিশোরদের মধ্যে তামাক ও ই-সিগারেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তামাক কোম্পানিগুলো তরুণদের লক্ষ্য করে ডিজিটাল মাধ্যমে আগ্রাসী বিপণন চালাচ্ছে। তামাক ব্যবহারে কল্যাণমূলক ব্যয়ের পরিবর্তে ধূমপায়ীর পকেট থেকে অনেক অর্থ চলে যাচ্ছে। এমনকি চিকিৎসাও অনেকসময় তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে না। তাই তরুণদের সুরক্ষায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী দ্রুত পাস করতে হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ কর্মসূচির অতিরিক্ত পরিচালক ডা: মাহফুজুর রহমান বলেন, তামাকের ধোঁয়া শুধু ধূমপায়ীকেই নয় আশপাশের মানুষকেও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরোক্ষ ধূমপান শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। দেশে ১৫ বছরের নিচে ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিভিন্ন রোগে ভুগছে। এই বিপদ থেকে সুরক্ষা পেতে পাবলিক প্লেস ও পরিবহন থেকে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বাতিল করতে হবে, এমন কোনো স্থান রাখা যাবে না। পাশাপাশি বিক্রয়স্থলে তামাকপণ্যের প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে, যাতে শিশু-কিশোররা এসব দেখে তামাকের প্রতি আকৃষ্ট না হতে পারে। এ ছাড়া তামাক কোম্পানির তথাকথিত সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন, কারণ এসব কার্যক্রম তরুণদের প্রলুব্ধ করে। অধূমপায়ী ও তরুণদের সুরক্ষায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন দ্রুত সংশোধন করা এখন সময়ের দাবি।





