Trending

ইউরোপের ‘জলবায়ু’ পাল্টে দিচ্ছে চীন!

ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হচ্ছে চীনের। অভিযোগ পাওয়া গেছে গুপ্তচরবৃত্তির। নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে লিখেছেন  সালাহ উদ্দিন শুভ্র 

চীনের সঙ্গে ইউরোপের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। সম্প্রীতিও ছিল তাদের অনেক। তবে সম্প্রতি চীনা তৎপরতা বেড়েছে অনেক। আর ইউরোপ আছে বিপদে। তাদের বিপদ আসছে চারপাশ থেকে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ। সেখানে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির পেছনে ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন কম ছিল না। সেই যুদ্ধে তারা রাশিয়ার পাশাপাশি চীনকেও সমস্যায় ফেলতে পারবে বলে ভেবেছিল। সেই যুদ্ধ মাঝপথে থাকা অবস্থায় হামাস হামলা চালায় ইসরায়েলে। তারপর মাথা ঘুরে যায় পশ্চিমের। গাজায় হামলা চালাতে তারা ইসরায়েলকে সমর্থন দিতে থাকে। সেই হামলা আজও থামেনি। কিন্তু এমন নৃশংস গণহত্যা চলতে থাকলে শান্তি আসবে না ইউরোপে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি যে চাপ অনুভব করেছে তার অভ্যন্তরে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গাজায় হামলা বন্ধের দাবিতে লাগাতার বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। বিক্ষোভের শুরুতেই হামলা করেছে পুলিশ, গ্রেপ্তার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেককে বহিষ্কার করেছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে এমন বিক্ষোভ বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জো বাইডেনের জন্য। তার ভোট কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। ফলে আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে ট্রাম্পের জন্য। যা আবার চিন্তায় ফেলেছে ইউরোপকে। কারণ ট্রাম্প ইউরোপকে পছন্দ করেন না। এ পরিস্থিতিতে চীন অনেকটা চিন্তামুক্ত। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তারা ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ে নাক গলিয়ে বেড়াচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তিসহ নানা উপায়ে গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে বলে খবর। তেমন এক অভিযোগ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। এর আগে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে প্রযুক্তির মাধ্যমে।

যেসব অভিযোগ

নিউ ইয়র্ক টাইমসে এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক সদস্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করা যুবক এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ডানপন্থি এক জার্মান সদস্যের সহকারীর বিরুদ্ধে সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে চীনের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির। এদের মধ্যে প্রথম যুবক সবসময় চীনের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে আসছিলেন। সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হিগিন্স ওয়ারশ এবং ক্রিস্টোফার এফ. শুয়েৎজ প্রতিবেদনে জানান, সব মিলিয়ে, তিনটি পৃথক মামলায় ছয়জনের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহে চীনের হয়ে ইউরোপে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়। যাদের দুজন ব্রিটেনে এবং চারজন জার্মানিতে অবস্থান করছেন। তারা বলছেন, এ সময় চীনের গুপ্তচরবৃত্তির খবর যুক্তরাজ্য ও জার্মানির সঙ্গে চীনের যে অতীতের উষ্ণ সম্পর্ক তাতে একটি বড় ধাক্কা লাগল। ওই প্রতিবেদনের ভাষ্যে, শুক্রবার যখন দুই গুপ্তচরকে লন্ডনের প্রাথমিক আদালতে হাজির করা হয়, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি জে. ব্লিঙ্কেন বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে দেখা করে বাণিজ্য, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনতে বৈঠক করেন। 

তারা জানায়, ব্রিটেন এবং জার্মানি ছয় নাগরিককে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করার পরপরই নেদারল্যান্ডস এবং পোল্যান্ড বুধবার চীনা নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহকারী অফিসে অভিযান চালায়। এ সন্দেহে যে তারা অবৈধ ব্যবসা করছে।  ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো এ ধরনের কোনো অভিযান পরিচালিত হলো। এর আগে এপ্রিলের শুরুতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনায় সুইডেন এক চীনা সাংবাদিককে বহিষ্কার করে। ওই ব্যক্তি দুই দশক ধরে সুইডেনে বসবাস করছিলেন।

‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’র চেক গবেষক ইভানা কারাসকোভা বলছেন, বহু বছর ধরে বাণিজ্য নিয়ে নিয়মিত ঝগড়ার পর পুনর্মিলনের আশায় থাকা ইউরোপ এখন ‘চীনের সঙ্গে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে’। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে এখনো চীনের অটল বন্ধু রয়েছে, বিশেষ করে হাঙ্গেরি। তিনি একে অভিহিত করেছেন ‘বহুমাত্রিক দাবা খেলা’র সঙ্গে। কারাসকোভার মতে, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আসার পরও ইউরোপ কিছু ক্ষেত্রে চীনকে প্রত্যাখ্যান করলেও উভয়ের স্বার্থরক্ষা করতে আগ্রহী হতে পারে।

বেশি বিপদে জার্মানি

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, জার্মানি এবং ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার জন্য গুপ্তচরদের ব্যবহার করছে চীন। যা ইউরোপের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ চীন ব্যবসা সম্পর্কিত সুবিধা কাজে লাগিয়ে গোপনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রসারিত করছে। এটি ছিল মূলত রাশিয়ার বৈশিষ্ট্য। জার্মানি বেশি বিপদে আছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে বলতে চেয়েছে। তাদের ভাষ্যে, এ দুই দেশ একসময় পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জার্মানির নিরাপত্তা পরিষেবা ২০২২ সাল থেকে চীনকে বিশ্বাস করার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরুর পর জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান টমাস হালডেনওয়াং সংসদে বলেছিলেন, ‘রাশিয়া হলো ঝড় আর চীন হলো জলবায়ু পরিবর্তন।’ জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাটি এরপর এক সতর্ক বার্তায় বলে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন উচ্চমানের রাজনৈতিক তথ্য পেতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে অন্যান্য দেশে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।  জার্মানির রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবশ্য এ সপ্তাহ পর্যন্ত অনেক দ্ব্যর্থহীন ছিল। চ্যান্সেলর ওলাফ স্কোলজ সম্প্রতি বাণিজ্য এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে তাদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীনে রাষ্ট্রীয় সফরও করেছেন।

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেসার এ সপ্তাহে চীনের কর্মকাণ্ড নিয়ে বলেছেন, তারা ব্যবসা, শিল্প এবং বিজ্ঞানে চীনা গুপ্তচরবৃত্তির বিপদ সম্পর্কে সচেতন আছেন। তিনি বলেন, আমরা এ ঝুঁকি এবং হুমকি ঘনিষ্ঠভাবে দেখছি এবং স্পষ্ট সতর্কতা জারি করেছি, যাতে সচেতনতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাও বৃদ্ধি পায়।

যদিও চীনের বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ যত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, চীন গুপ্তচরবৃত্তি তত বাড়ায়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন, চীনের বিরুদ্ধে অপবাদ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এক প্রতিক্রিয়ায় তারা জার্মানিতে ‘দূষিত প্রচার’ এবং ‘চীন বিরোধী রাজনৈতিক নাটক বন্ধ করার’ দাবি জানিয়েছে। চীন বিশেষজ্ঞ এবং বার্লিনে জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো মারেইকে ওহলবার্গ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চীন এ ধরনের সতর্ক বার্তা পায়নি। এখন জার্মান কর্র্তৃপক্ষ বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসতে খুব আগ্রহী অথবা তাদের আর ধৈর্য নেই।

গুপ্তচরবৃত্তি

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, এ সপ্তাহে জার্মানিতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তিনজন হলেন স্বামী-স্ত্রী এবং অপর এক পুরুষ। যারা ইনোভেটিভ ড্রাগন নামক একটি জার্মান ‘মেরিন প্রপালশন সিস্টেম’ (নৌ পরিচালন ব্যবস্থা) কোম্পানির সংবেদনশীল তথ্য পাচার করে অর্থনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে জড়িত বলে মনে হচ্ছে। তারা ওই কোম্পানির মাধ্যমে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার কিনে অনুমতি ছাড়া চীনে রপ্তানি করেছিল বলেও অভিযোগ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চতুর্থ ব্যক্তি জিয়ান গুওক’র বিরুদ্ধে ‘বিশেষ করে গুরুতর মামলা’ আনা হয়েছে। তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কাজ করার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন। কাজ করছিলেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অতি ডানপন্থি দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’র সদস্য ম্যাক্সিমিলিয়ন ক্রাহ’র সহকারী হিসেবে। এ দলটি চীন এবং রাশিয়ার প্রতি বরাবরই বন্ধুত্বপূর্ণ। জুনের নির্বাচনে তারাও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। জার্মানির আদালত ক্রাহর বিরুদ্ধেও তদন্ত পরিচালনা করবে। আরও বলা হচ্ছে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি আগামীতে ইউরোপ ভ্রমণে বের হলেও ব্রিটেন আর জার্মানিকে এড়িয়ে যাবেন। তিনি যাবেন দুই বন্ধুরাষ্ট্র হাঙ্গেরি আর সার্বিয়ায়। তার সফরসূচিতে রয়েছে ফ্রান্সও। 

লন্ডনে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি হলেন ক্রিস্টোফার ক্যাশ এবং ক্রিস্টোফার বেরি। গত বছরের মার্চ মাসে গ্রেপ্তার করার পর জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু তাদের নাম চলতি সপ্তাহে অভিযোগ না আনা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। তারা দুজনই ক্ষমতাসীন দলে যুক্ত। এক বিবৃতিতে তাদের বিষয়ে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ বলেছে, ক্যাশ এবং বেরির বিরুদ্ধে ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তারা ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শত্রুর জন্য দরকারি’ তথ্য সরবরাহ করেন। আর ‘অভিযোগগুলো যে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত তা হলো চীন।’

বন্ধু থেকে শত্রু

ব্রিটিশ চীনা বিশেষজ্ঞ এবং লেখক মার্টিন থরলি তার প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা ‘অল দ্যাট গ্লিসটেনস’ বইয়ে  দেখিয়েছেন, এক দশক আগে চীন-ব্রিটিশ বন্ধুত্বের ‘সোনালি যুগ’ কীভাবে বদলে গেছে। তখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। তিনি চীনকে তাদের রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই ‘সুবর্ণ যুগ’ ব্যাপকভাবে ‘সুবর্ণ ত্রুটি’ হিসেবে উপহাস করছে। ক্যামেরন বর্তমানে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচিব। সম্প্রতি তিনিও চীনের কঠোর সমালোচক হয়ে উঠেছেন। তিনি এখন চীনকে ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তার এ বক্তব্য প্রতিফলিত করে ইউরোপের বাস্তবতাকে ব্রিটিশ লেখক থার্লি বলছেন, প্রথাগত গুপ্তচরবৃত্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চীন কি এমন লোকদের ‘সুপ্ত নেটওয়ার্ক’ ব্যবহার করছে, যারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের জন্য কাজ করে না, কিন্তু বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের হয়ে কাজ করে। 

হার্ভার্ডের ‘ফেয়ারব্যাঙ্ক সেন্টার ফর চায়নিজ স্টাডিজ’র রিসার্চ ফেলো হামফ্রে বলেন, ‘একটা সময় ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে চীন সম্পর্কে খারাপ শব্দ শুনতে চায়নি।’

প্রতিবেদনের সার্বিক বক্তব্যে মনে হয়, ইউরোপে চীন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মূলত এ পরাশক্তির বিরোধ থাকলেও তা এখন সম্প্রসারিত হচ্ছে ইউরোপেও। ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে কে কোন এলাকা দখলে রাখবে তা নিয়ে এ যেন এক দাবা খেলা। ইউরোপেই যেমন চীনের বিরোধিতা আছে, আবার পক্ষপাতও আছে। ফলে জটিলতা ক্রমে বাড়ছে ইউরোপের জন্য।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button