
নিজাম হাজারীর অন্য খেলা
পাঁচই আগস্টের ক্ষোভ এখনো নিজাম উদ্দিন হাজারীর বাড়ি বইয়ে বেড়াচ্ছে। প্রবেশ গেটের পাশেই পুড়ে ছাই হয়ে আছে প্রাইভেটকার। অগ্নিদগ্ধ বাড়ি দেখেই বোঝা যায় নিজাম হাজারীর প্রতি ফেনীবাসীর কতো ক্ষোভ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজাম হাজারী ছিলেন ফেনীর মূর্তমান আতঙ্ক। গডফাদার। তার আঙ্গুলি হেলনীতে চলতো ফেনীর সবকিছু। আড়ালে-আবডালে ফেনীর মানুষ তাকে উপাধি দিয়েছে ওস্তাদ মারা সাগরেদ। একসময় ছিলেন জয়নাল হাজারীর শিষ্য। মাঝেমধ্যে হাজারীর গাড়িও চালাতেন। আর জয়নাল হাজারীর পতনের পর ফেনীর নিয়ন্ত্রণ নেন নিজাম হাজারী। নিজেই তৈরি করেন একের পর এক বাহিনী। এমনকি জয়নাল হাজারীকে পর্যন্ত ফেনীতে যেতে দেননি এই নিজাম হাজারী। তার ভয় জয়নাল হাজারী যদি আবার তার সাম্রাজ্যে হাত বাড়ান। এ ভয় এখনো আছে তার মাঝে। ৫ই আগস্ট ফেনী ছেড়ে পালিয়ে যান ভারতে। সেখান থেকেই এখন পরিচালনা করছেন নিজ দলের লোকজনকে। ফেনীর একজন স্কুলশিক্ষক মনির উদ্দিন বলেন, নিজাম হাজারী ফেনীতে অসংখ্য মিনি গডফাদার তৈরির কারিগর। জেলার এমন কোনো গ্রাম নেই, যেখানে তার থাবা পড়েনি। একসময় জয়নাল হাজারীর গাড়ি চালক থেকে হন স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য। ২০০৮ সালে ভাগ্যের রাশি ঘুরে যায়। দলের শীর্ষ এক নেতার বদৌলতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে যান। এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করেন এক সাংবাদিক নেতাও।
২০০১ সালে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে ভারত পালিয়ে গেলে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায় জয়নাল হাজারীর সাজানো রাজ্য। বিএনপি সরকার গঠন করলে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে জেলা আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সালে হাজারী ফিরে এলেও আর রাজনীতিতে ফেরা হয়নি। এর আগেই নির্বাচনের উসিলায় হাজারীর রাজত্বে প্রবেশ করেন নিজাম হাজারী।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হলে ফেনী থেকে পালিয়ে যান নিজাম হাজারী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। ফেনীর নিয়ন্ত্রণে এখনো মরিয়া । প্রতিনিয়ত দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। অভিযোগ আছে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গেও তার সখ্যতা রয়েছে। বিদেশে বসে মাঝেমধ্যে অনলাইনে কনফারেন্স করেন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে। ফেনীতে গণ-অভ্যুত্থানে হামলার ঘটনায় ৮টি হত্যাসহ ২৫ মামলার আসামি এখন নিজাম। এসব মামলার নিয়মিত খবর রাখার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কেও তথ্য জোগাড় করছেন। মাসিক ভাতা দেন অনেককে। অভিযোগ রয়েছে গণ-অভ্যুত্থানে মহিপালের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যাচেষ্টা মামলাগুলোতে নিজ দলের লোকদের আসামি করতে নিজামের মদত ও আর্থিক বরাদ্দ নিয়ে। টাকা দিয়ে এসব মামলায় নিজ দলে তার বিরোধীদের আসামি করিয়েছেন। অনেকে অভিযোগ করেন, জয়নাল হাজারীর উত্থান ও পতন দু’টোই দেখেছেন নিজাম হাজারী। সিংহাসন নড়বড়ের শঙ্কায় নিজ দলের লোকদেরও বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার মতে যেসব নেতা জেলা ও দেশে অবস্থান করছেন তাদের ধাক্কায় ক্ষমতা হারাতে হতে পারে। সে শঙ্কা থেকে ভারত-নেপাল, সিঙ্গাপুর ও তুরস্ক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
নিজামের এখন টার্গেট জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট এম শাহজাহান সাজু। তিনি জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি জেলা শহর ছাড়েননি এক মিনিটের জন্য। যদিও তার চেম্বারে হামলা-অগ্নি সংযোগ করা হয় ৫ই আগস্ট রাতে। এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৬টি। কিন্তু সাজুকে নিয়ে ভয় কেন তার? এ ভয় থেকেই শুরু করেছেন অন্য খেলা। শাহজাহান সাজু পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসাবে ফেনীতে পরিচিত। সকল দলের সঙ্গেই রয়েছে তার সখ্যতা। ৫ই আগস্টে সকল নেতা পালিয়ে গেলেও সাজু ফেনী ছেড়ে পালাননি; বরং বিভিন্ন মামলায় নিজ দলের কর্মীদের আইনজীবী হয়ে লড়ছেন আদালতে। এডভোকেট মো. শাহজাহান সাজু বলেন, আমি অনেকেরই টার্গেট। নিজাম হাজারী মনে করছেন তার সাম্রাজ্য আমার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। দলীয় নেতাকর্মীরা আমাকে ভালোবাসে। আমার কাছে আসে। এ কারণে নিজাম হাজারী আমার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। তিনি বলেন, ফেনী সদরে ৮টি হত্যা মামলা ও ৩০টি আহত মামলার আসামি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ অনেক সাধারণ মানুষ। মামলাগুলোতে আসামি রয়েছে এমপি, মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যানও। আসামির সংখ্যা ১১ হাজারের উপরে। আমি এসব মামলার আসামিপক্ষে লড়ছি। তবে অবশ্যই আসল অপরাধীদের বিচার চাই। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায় সেটাই আমার চেষ্টা। তিনি বলেন, আসলে মামলাতে রাজনীতিকরণ করা হলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। মামলার কারণে আসামিদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করতে হয়।
আসামিরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এতে নিজাম হাজারী মনে করছে তার রাজ্য ফেনী আমার দখলে চলে যাচ্ছে। এজন্য তিনি এখন অন্য খেলায় নেমেছেন। দেশের বাইরে পালিয়ে থেকেও তার রাজত্ব ধরে রাখতে বিভিন্ন পর্যায়ে মাসিক মাসোয়ারা দিচ্ছেন। অনেকে এসে আমাকে এসব বলে। শেষ পর্যন্ত ৫ই আগস্টের নয় মাস পর আমার বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা করানো হয়। এর পেছনে রয়েছে নিজাম হাজারী। গত মে মাসের ৪ তারিখ একটি গোয়েন্দা সংস্থার লোক এসে বলেন, আপনাকে থানায় যেতে হবে। ওসি সাহেব আপনাকে যেতে বলেছেন। আমি তখন চেম্বারে বসা। চেম্বার বন্ধ করে থানায় যাই। ওসিকে জিজ্ঞেস করি কেন আমাকে আসতে বলেছেন? তিনি উত্তর দিতে পারছেন না। অনেকক্ষণ পর এক এসআইকে বলেন, মামলা রেডি হয়েছে? এসআই উত্তর দেন এখনো হয়নি। ওসি এসআইকে ধমক দিয়ে দ্রুত করার তাগিদ দেন। প্রায় তিন ঘণ্টা থানায় বসে থাকার পর মামলা হয়। এরপর আমাকে থানা হাজতে দেয়া হয়। এসময় একজন এসে বলেন, ৩০ লাখ টাকা দেন আপনাকে ছেড়ে দেবো। আমি বলেছি চল্লিশ লাখ টাকা দেবো আমাকে এখনই ছেড়ে দিতে হবে। আমি জানি এখন আর ছাড়ার কোনো প্রকারেই সম্ভব নয়। এরপর ওই লোক আমাকে হুমকি দেয় আপনার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হবে। পরদিন আদালতে উঠালে দলমত নির্বিশেষে দু’জন ছাড়া সকল আইনজীবী আমার পক্ষে দাঁড়ায়। তারা আমার রিমান্ড চেয়েছিল। কিন্তু বিচারক রিমান্ড না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একমাস পর জামিনে বেরিয়ে আসি। এখন আদালতে নিয়মিত আছি। ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার কার্যকলাপে নাখোশ ছিলেন সাজু। নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে সাজুর চেম্বার ভাঙচুর করা হয়েছিল। এখন নিজাম হাজারী মনে করছেন সুযোগ পেলে হাজারীকে যেভাবে মাঠছাড়া করে নিজে দখল নিয়েছিলেন, তেমনি সাজুও জেলার নেতৃত্ব দখলে নিতে পারেন। নাম প্রকাশে এক আইনজীবী বলেন, ফেনীতে এখন টাকা উড়ছে। সব নিজাম হাজারীর টাকা। তার রাজত্ব যেন হাতছাড়া না হয় এজন্য তিনি গ্যাং লালনপালন করছেন। সমপ্রতি সোনাগাজী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আওয়ামী লীগের লোকজন বলছেন এর পেছনেও নিজাম হাজারীর মদত আছে। এখানেও একই কারণ লিপটনকেও ভয় পাচ্ছেন নিজাম। এ জন্যে সাজু-লিপটনকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে চাইছেন না। ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক নেতাই নিজামবিরোধী ছিল। প্রতিবাদ করে অনেকে তখনো হামলা-মামলার শিকার হয়েছিলেন। কোনঠাসা ছিলেন নিজ দলেই।
মামলা বাণিজ্যের ব্যাপারে শাহজাহান সাজু বলেন, তিন ধাপে মামলা বাণিজ্য হয়। প্রথমত মামলা দায়েরের সময়। কিছু লোক আছে যারা এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তারা নির্দোষ ব্যক্তিদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে বাণিজ্য করে। এর জামিন করাতে গিয়ে হয় বাণিজ্য। শেষমেশ হয় কেউ জামিনে বের হলে ফের তাকে জেলগেটে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন একবার বাণিজ্য হয়। টাকা দিতে পারলে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যথায় আরেক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হয়।






