
থমথমে খাগড়াছড়ি সেনা পাহারায় পর্যটক যাতায়াত
খাগড়াছড়িতে তৃতীয় দিনের মতো জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানারে সড়ক অবরোধ করেছে আন্দোলনকারীরা। সোমবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ি থেকে সকল ধরনের দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ ছিল। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। শহরের বিভিন্ন মোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে ৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এখনো খাগড়াছড়িতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যদিও কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববার ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গুইমারায় অবরোধকারীরা সংঘবদ্ধ হলে পাহাড়ি-বাঙালি উত্তেজনা দেখা দেয়। এর মধ্যে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ৩ জন নিহত হন। এ ঘটনায় ১৩ সেনা সদস্য, ৩ পুলিশ সদস্যসহ ২৮ জন আহত হন। এ সময় আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় অসংখ্য দোকানপাট-ঘরবাড়ি। এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে জেলা জুড়ে। এজন্য বিজিবি, পুলিশসহ বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এদিকে, অবরোধে সাজেকে আটকে থাকা প্রায় পাঁচ শতাধিক পর্যটককে সেনাবাহিনীর স্কটে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি আনা হয়। এরপর পর্যটকদের আবার খাগড়াছড়ি থেকে রামগড় অবরোধ শেষ এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। সাজেক থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। ঢাকাগামী এসব পর্যটকরা রাতেই ঢাকা পৌঁছেন।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল বলেন, খাগড়াছড়িতে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ নিরাপত্তায় যৌথভাবে কাজ করছে। নতুন করে যাতে আর কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয় সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বলেন, খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তা পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
সার্বিক বিষয়ে বিজিবি’র সংবাদ সম্মেলন
ওদিকে, উদ্ভূত উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে খাগড়াছড়ি বিজিবি সেক্টর। গতকাল বিকাল ৪টায় স্বনির্ভর এলাকায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কথা বলেন, খাগড়াছড়ি বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. আব্দুল মুত্তাকিম। তিনি বলেন, গত ২৭শে সেপ্টেম্বর স্বনির্ভর বাজার ও চেঙ্গি স্কয়ারের আশপাশে পাহাড়ি ছাত্র-জনতা ও বাঙালিদের মধ্যে সহিংসতা রোধে ৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ঘটনার প্রথম দিনেই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিজিবি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কতিপয় দুষ্কৃতকারীরা স্বনির্ভর বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। আমরা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে কোনো প্রকার হতাহতের ঘটনা ব্যতীত স্বনির্ভর এবং চেঙ্গি এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। আমাদের ৯টি প্লাটুন খাগড়াছড়ি শহর ও স্বনির্ভর বাজারে দিনে ও রাতে সার্বক্ষণিক টহল পরিচালনা করছে। এ ছাড়াও যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও ২টি প্লাটুন স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে।
বিজিবি কমান্ডার বলেন, চলমান পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে খাগড়াছড়ি শহর ও স্বনির্ভর বাজার এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করেছি। এ ছাড়াও সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়মিত টহল পরিচালনা করে এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি পৃথক কোনো জাতি নয়। আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা সকলেই বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা সকলেই শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে চাই। আমি আপনাদের সকলকে আহ্বান করবো শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় রাখার জন্য।
তিনি আরও বলেন, আমি আপনাদের আরও আশ্বস্ত করতে চাই, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিজিবি নিরবচ্ছিন্নভাবে খাগড়াছড়ির সাধারণ জনগণের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করবে এবং সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। এ সময় খাগড়াছড়ি-৩ বিজিবি’র অধিনায়ক, সেক্টর সদর দপ্তরের সহকারী পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা, সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২৩শে সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সদরে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক মারমা কিশোরী ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় শয়ন শীল নামে একজনকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় গ্রেপ্তার করে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রাখে পুলিশ। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিল করে পাহাড়ি বিভিন্ন সংগঠনগুলো। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে ২৫শে সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানারে অর্ধদিবস সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। আর এ অবরোধ সফল করতে এতে পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি জানায় পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)সহ তাদের অনুগত সহযোগী সংগঠনগুলো।






