
পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ সংবিধান সংশোধনের ৪৫ দিনে বাস্তবায়ন
প্রধান উপদেষ্টার কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জমা: সংসদ অধিবেশন চালুর পর ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধন; ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপন * বিশেষ আদেশ জারির চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি গণভোটে
নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা প্রথম অধিবেশন শুরুর ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংশোধন করবেন। এই সময়ের মধ্যে তারা সংবিধান সংশোধনে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। এরপর ৪৫ দিনের মধ্যে পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সরকার গঠনের পর থেকে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নে সময় লাগবে ৩১৫ দিন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এমন সুপারিশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এক্ষেত্রে কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) আমলে নেওয়া হয়নি। মঙ্গলবার এই সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সুপারিশে আরও বলা হয়, সনদ বাস্তবায়নে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ভিত্তি ধরে সরকার একটি আদেশ জারি করবে। আদেশের নাম হবে-‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫।’ সনদের চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দিতে হবে গণভোট। তবে গণভোটের সময় সরকার নির্ধারণ করবে।
সুপারিশ জমা দেওয়ার পর রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ সময় তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দুটি বিকল্প সুপারিশ করেছে কমিশন। এর মধ্যে সরকারি আদেশ জারি ও গণভোট রয়েছে। এছাড়া জুলাই সনদের ৮৪টি সুপারিশ তিন ভাগে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে কমিশন। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব গণভোটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া পরবর্তী সংসদ দুটি দায়িত্ব পালন করবে। প্রথমত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, দ্বিতীয়ত, নিয়মিত আইনসভা। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমসহ কমিশনের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে সুপারিশে ক্ষুব্ধ বিএনপি। দলটি বলছে, সুপারিশে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা আলোচনার টেবিলেই ছিল না। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট চায়।
আদেশ জারি : সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য ‘সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী’ জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন। সেজন্য গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও ওই পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার ‘অপরিহার্য’। এই আদেশ জারির পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে উপযুক্ত সময়ে অথবা নির্বাচনের দিন গণভোট হবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। গণভোটে ভোটারদের কাছে প্রশ্ন থাকবে ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফশিল ১-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত খসড়া বিলের প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ গণভোটে জনগণের সায় পেলে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। একই সঙ্গে তারা জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
দুটি বিকল্প : পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার করবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি বিকল্পের সুপারিশ করেছে কমিশন। প্রথম বিকল্পে বলা হয়েছে, গণভোটের আগে জনগণের জ্ঞাতার্থে এবং সাংবিধানিক পরিষদের দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে সরকার প্রণীত একটি খসড়া বিল গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। এই খসড়া বিলের বিষয়টি দ্বিতীয় বিকল্পে রাখা হয়নি। প্রথম বিকল্পে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নির্ধারিত ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংবিধান সংস্কার বিল ‘গৃহীত হয়েছে’ বলে গণ্য হবে এবং তা সংবিধান সংস্কার আইন হিসাবে কার্যকর হবে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের এক নতুন যাত্রার সুযোগ এবং সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে রাষ্ট্রকাঠামো ফ্যাসিবাদী শাসন তৈরি করেছিল তারও আগে গণতন্ত্রচর্চার ক্ষেত্রে বারবার যে হোঁচট খাওয়ার অভিজ্ঞতা সেগুলোকে মোকাবিলা করে বিবেচনায় রেখেই যেন রাষ্ট্র সংস্কারের এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সুপারিশ করা হয়। তিনি বলেন, ‘এই সুপারিশগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ যেন একটি আইনি ভিত্তি পায়। ভবিষ্যতের পথরেখা হিসাবে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো যেন বাস্তবায়িত হয়।’
তিন ভাগে সুপারিশ বাস্তবায়ন : সুপারিশে প্রধানত তিনটি ভাগ আছে। ‘প্রথমটি হচ্ছে যেসব বিষয়ে সাংবিধানিক বিষয় সংশ্লিষ্ট নয়, সেসব বিষয়ে সরকার যেগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারেন সেটা যেন অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়িত করা হয়।’ ‘দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে এর মধ্যে সুপারিশের অনেক কিছুই আছে যেগুলো সরকারি নির্দেশ এমনকি অফিস অর্ডার দিয়েও বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেগুলো যেন সরকার দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে। এ দুটো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনোরকম ভিন্নমত নেই এবং এটা আলোচনার মধ্য দিয়ে যখনই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা সেটা সরকারকে অবহিত করেছি।’ আলী রীয়াজ বলেন, ‘কোনগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনগুলো অফিস অর্ডারের মাধ্যমে করা যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করেছি সাংবিধানিক বিষয়গুলোতে অনেক অনেক বিষয়ে ঐকমত্য আছে। কিছু বিষয়ে ভিন্নমত আছে।’ ‘এই সংবিধানসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বাস্তবায়নের একটি আইনি ভিত্তি প্রদান এবং বাস্তবায়নের পথ নির্দেশ করার জন্য আমরা তৃতীয় সুপারিশে কীভাবে এগুলোকে বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া যায় তার সুপারিশ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানসংশ্লিষ্ট ৪৮টি বিষয়ের ব্যাপারে আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেছি, দুটো বিকল্প প্রস্তাব সরকারের হাতে আছে। এর দুটো বিকল্পেরই কিছু কিছু জিনিস এক, কিন্তু সামান্য ভিন্নতাও আছে আমাদের প্রস্তাবে। আমরা অনুরোধ করেছি, সরকার যেন অবিলম্বে একটি আদেশ জারি করে। এই আদেশের বিষয় হবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ সংবিধান সংস্কারবিষয়ক। সরকারের এই আদেশের অধীনে সরকার একটি গণভোটের আয়োজন করবে। এই গণভোটে জনগণের কাছে আমরা সুপারিশ করেছি সরকার যেন একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সেটি হচ্ছে এই যে আদেশ এবং আদেশের তফশিলে অন্তর্ভুক্ত ৪৮টি সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে জনগণের সম্মতি আছে কিনা? আমরা যে সুপারিশ করেছি তাতে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং জাতীয় সংসদ হিসাবে কার্যকর থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর থাকবে ২৭০ দিন। এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যরা জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত এবং গণভোটে যদি সবার সম্মতি পাওয়া যায় সেই বিষয়গুলো সংবিধানে সংযুক্ত করার জন্য প্রয়োজনে সবরকম বিধি-বিধান প্রয়োজনীয় সংশোধন সংযোজন বিয়োজন পরিবর্ধন পরিমার্জন করবেন।
পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ : পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সুপারিশে বলা হয়, একটি অন্যতম বিষয় হচ্ছে একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা। সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিল ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা। সেই অনুসারে জনগণের সম্মতি পেলে সংসদ প্রতিষ্ঠার ৪৫ দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠনবিষয়ক প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হবে।
গণভোট কখন : আলী রীয়াজ আরও বলেন, গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারকে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেধে দেয়নি ঐকমত্য কমিশন। সুপারিশে কমিশন বলেছে, আদেশ জারির পর থেকে জাতীয় নির্বাচনের দিন পর্যন্ত যেকোনো দিন গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা সরকারকে বলেছেন, এগুলো জনগণের কাছে নিয়ে যেতে। জনগণের রায় পাওয়ার পর রাজনৈতিক দল সিদ্ধান্ত নেবে।
নোট অব ডিসেন্ট : জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ২২টি প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছিল বিভিন্ন দল। সনদে বলা হয়েছিল দলগুলো বিষয়টি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করবে। এরপর জনগণ তাদেরকে রায় দিলে সেই অনুসারে তারা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সনদ বাস্তবায়নের জন্য আদেশের তফশিলে সংবিধান সংশোধনের ৪৮টি প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কোনো নোট অব ডিসেন্ট রাখা হয়নি।
নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়নযোগ্য : ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৯টিই প্রস্তাব জুলাই আদেশ জারির পরই নির্বাহী আদেশে কার্যকর যায়। এর মধ্যে রয়েছে-উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটাইজ করা, আইনজীবীদের আচরণবিধি তৈরি, গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন, কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন, দুর্নীতিবিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন, পরিষেবা খাতের কার্যক্রম ও তথ্য অটোমেশন করা এবং ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের পক্ষভুক্ত হওয়া। এতে দলগুলোর ঐকমত্য রয়েছে।
গণভোটের ফল ‘না’ হলে কী হবে : গণভোটে ভোটাররা সম্মতি না দিলে কী হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘না’ সূচক সম্মতি দিলে এই প্রক্রিয়ার সেখানেই ইতি ঘটবে। এটি আর আগাবে না। তবে তিনি বলেন, জনগণের ওপর আস্থা রাখতে হবে। কারণ বাংলাদেশের জনগণ সচেতন। তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এ সময়ে পৃথিবীর অন্য একটি দেশের গণভোটের উদাহরণ দেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ : সুপারিশে বলা হয়েছে, নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরু থেকে ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কারেরর কাজ শেষ করবে। এই কাজ শেষ হওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিলীন হয়ে যাবে প্রথাগত সংসদে। তবে ২৭০ দিনের মধ্যে যদি সংস্কার আনা না যায়, তবে কী হবে? তার ব্যাখ্যায় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ২৭০ দিনের মধ্যে তা অনুমোদন না করলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান (স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের মতো) নির্বাচন করবেন। কোরামের জন্য ন্যূনতম ৬০ (ষাট) জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতিই যথেষ্ট হবে। সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রয়োজন হবে পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে এমপি হিসাবে শপথ নেবেন। এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে আরেকটি শপথ নেবেন।
প্রসঙ্গত, জুলাই সনদ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতসহ ২৪টি দল সনদে স্বাক্ষর করেছে। পরের দিন স্বাক্ষর করে গণফোরাম। অর্থাৎ ২৫টি দল ইতোমধ্যে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অংশজন এনসিপি এখনো সই করেনি। দলটি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের লিখিত কপি এবং গণভোটের প্রশ্নটি চূড়ান্ত করে আগেই জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে। তবে গণভোটের ব্যাপারে দলগুলো একমত হলেও ভোটের সময় নিয়ে আপত্তি আছে। বিএনপি বলছে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে ভিন্ন ব্যালটে হবে। জামায়াত ও এনসিপি বলছে আগে গণভোট, পরে জাতীয় নির্বাচন। এ নিয়ে বর্তমানে মাঠে আন্দোলন করছে জামায়াতসহ ৮ দল। ফলে এই সনদ বাস্তবায়নে সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের সুযোগ নেই: বিএনপি
জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট হবে, তার আগে গণভোট নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ দেখছে না বিএনপি। মঙ্গলবার বিকাল গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এমনটাই জানান দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এদিন জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের উপায়-সম্পর্কিত সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাতে এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে যথোপযুক্ত সময়ে অথবা উক্ত নির্বাচনের দিন এই আদেশ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠান করা হইবে।’ এ প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমির খসরু বলেন, ‘আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি পুরো আলোচনায়। বিএনপির অবস্থান ছিল যে, গণভোট আর নির্বাচন একই দিনে হবে দুটো ব্যালটের মাধ্যমে। এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এই ব্যাপারে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের দিন দুইটা ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট হবে।’ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ নিয়ে এই বিএনপি নেতা বলেন, ‘আমাদের অনেকগুলো রেকমেন্ডেশন (সুপারিশ) ছিল, যেগুলো ঐকমত্যে আসেনি। কিছু ঐকমত্যের পরিপ্রেক্ষিতে সমাধান হতে হবে, ঐকমত্যের বাইরে গিয়ে কে, কী বলছে; কে কী রেকমেন্ড করছে, এটা তাদের ব্যাপার। আমাদের সেখানে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ঐকমত্যের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু বিএনপি এখানে ঐকমত্য পোষণ করে না, সেদিকে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।’
ঐকমত্য কমিশন ‘অনৈক্য’ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে- সালাহউদ্দিন : এদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে ‘অনৈক্য’ প্রতিষ্ঠার একটা প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে আইন উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার পর বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছে সেই স্বাক্ষরিত সনদবহির্ভূত অনেক পরামর্শ বা সুপারিশ, সনদ বাস্তবায়নের আদেশের খসড়ায় যুক্ত করা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ৮৪টি দফা সম্ভবত, সেখানে বিভিন্ন দফায় আমাদের এবং বিভিন্ন দলের কিছু ভিন্নমত আছে, নোট অব ডিসেন্ট আছে। পরিষ্কারভাবে সেখানে উল্লেখ করা আছে যে, এসব নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলো যারা দিয়েছে, তারা যদি নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয় তাহলে তারা সেভাবে সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন। সেটা এই প্রিন্টেড জাতীয় জুলাই সনদের যে বই এখানে আপনারা পাবেন সব দফায় দফায় যেখানে যেখানে ডিসেন্ট আছে সেখানে আছে। অথচ বিস্ময়করভাবে আজকে যে সংযুক্তিগুলো দেওয়া হলো সুপারিশমালার সঙ্গে, সেখানে এই নোট অব ডিসেন্টের কোনো উল্লেখ নেই।’ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে কমিশনের সুপারিশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘হয়তো বা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমস্যাটা নিয়ে আবার আলোচনা হতে পারে। এখানে একটা নতুন বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে যে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের নামে একটা আইডিয়া এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে। যেটা আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কখনো টেবিলে ছিল না, আলোচিত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি।’
নভেম্বরের মধ্যে গণভোট দিতেই হবে: জামায়াত
জুলাই সনদের আদেশ জারি করে নভেম্বরের মধ্যে গণভোট চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদের আদেশ জারি করে নভেম্বরের মধ্যে গণভোট দিতেই হবে।
মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় এক কর্মসূচিতে এসব কথা বলেন তিনি। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, যারা জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট চায় তারা জুলাই সনদকে অকার্যকর করতে চায়। তাদের খারাপ উদ্দেশ্য জাতি বুঝে গেছে। এরা প্রথমত জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই রাজি হয়নি। পরবর্তী সময়ে অন্য সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য দেখে কৌশলগত কারণে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে একমত হলেও তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। এজন্য তারা গণভোটের পক্ষে মত দিলেও গণভোট আয়োজন নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে নানারকম ভ্রান্ত যুক্তি উপস্থাপন করছে। জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট চাইলে তার আগে নভেম্বরে গণভোট হলে আপত্তি কেন জাতির সামনে স্পষ্ট করতে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ দেশের জনগণ বোকা নয়, জনগণকে ধোঁকা দেওয়া যাবে না। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একই দিনে ভোট হলে সহিংসতার আশঙ্কা থাকে। ফলে গণভোটও ব্যাহত হতে পারে। সেজন্য গণভোট ও ভোট আয়োজন আলাদা দিনে করাই সমীচীন।
জুলাই সনদকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছি: এনসিপি
ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কিত সুপারিশকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই সনদে স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের সুপারিশ ইতিবাচকভাবে আমরা দেখছি। এছাড়া নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই কমিশনের সবগুলো পয়েন্ট গণভোটে দেওয়ার যে আমাদের দাবি ছিল সেটিও ইতিবাচকভাবে এসেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে দলীয় ফোরামে হয়তো আজকালের মধ্যে আলোচনা হবে। এরপরই আমরা জুলাই সনদের স্বাক্ষরের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’
এর আগে রাজশাহীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা ড. ইউনূসকেই ঘোষণা করতে হবে উল্লেখ করে বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ অনুমোদিত হবে এবং এই আদেশটা ড. ইউনূস জারি করবেন। এই আদেশের বা সংস্কারের ভিত্তিটা হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থান। ড. ইউনূস জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈধতার জায়গা থেকে এই আদেশটি জারি করবেন। পরে যে সংসদ হবে সেখানে একটা সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা, সেখানে এসব পরিবর্তিত বিষয়গুলো সন্নিবেশিত হবে। এগুলো যখন নিশ্চিত হবে, তখনই আমরা সনদে স্বাক্ষর করব।’








