BangladeshCrimeElectionHotTrending

রাজনৈতিক সহিংসতার পুরনো ছক কি আবার ফিরছে? ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে সাজ সাজ রব। প্রচার-প্রচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। তবে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের দিনই ঘটে গেল এক শোকাবহ ও উদ্বেগজনক ঘটনা, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে।

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেল আরোহী এক দুবৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

এই নৃশংস হামলার পর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের প্রশ্ন তফসিল ঘোষণার পরদিনই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে নির্বাচনী পরিবেশ কতটা নিরাপদ?

চিকিৎসাধীন ওসমান হাদি

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শরীফ ওসমান হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি তার মাথার বাঁ পাশ দিয়ে প্রবেশ করে ডান পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, যা তাকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় নিয়ে যায়। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, শরীফ ওসমান হাদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির ওপর হামলা: নেপথ্যে কারা?

শরীফ ওসমান হাদিকে চলন্ত রিকশা থেকে টার্গেট করে গুলি করা হয়। হামলার দক্ষতা এবং পরিকল্পিত স্বভাব রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদাতা এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী শরীফ ওসমান হাদির ওপর এই হামলাকে শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণ এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এক সংকেতমূলক আক্রমণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপায়ণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতেই পরাজিত ও ফ্যাসিবাদী শক্তি পরিকল্পিতভাবে সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে।

তাদের দাবি, ইনসাফ, সাম্য এবং স্বাধীনতার পক্ষে ওসমান হাদির সোচ্চার অবস্থান একটি বিশেষ মহলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে তাকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র তাকে অনুসরণ করে আসছিল।

ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যাঁর কণ্ঠ সবসময় ছিল দৃঢ় ও উচ্চকিত, সেই দরাজ কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে বিরুদ্ধবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে নীলনকশা আঁকছিল। পরিকল্পিত এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নেতাদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে ভাড়াটে আততায়ী নিয়োগ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এর ধারাবাহিকতায় শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকে ‘সফল প্রয়োগ’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। বিশিষ্টজনদের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতার ওপর আক্রমণ নয়; বরং এটি দেশের গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আসন্ন নির্বাচনী পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ অশনি সংকেত।

অন্তর্বর্তী সরকারের কড়া প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনার পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

বিবৃতিতে বলা হয়,
“নির্বাচনী পরিবেশে এ ধরনের সহিংস হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।”

প্রধান উপদেষ্টা হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ওসমান হাদির সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়,
“নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে কোনো ধরনের সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। দোষীরা যে-ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”

গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। নিজেদের ‘অভ্যুত্থানে অনুপ্রাণিত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মঞ্চটির অফিশিয়াল ফেসবুক পাতায় উল্লেখ করা হয়েছে, “সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণই আমাদের লক্ষ্য।”

রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গভীর উদ্বেগ, নিন্দা ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ঘটনার পরপরই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো জায়গা নেই, কখনোই না। আমাদের মতাদর্শ যাই হোক না কেন, ভয়ভীতি বা শক্তির আশ্রয় নিলে তা সম্মিলিতভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।”

তিনি আরও লেখেন,
“যখন পুরো জাতি একটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন খোদ ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।”

এ সময় তিনি শরীফ ওসমান হাদির দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং সন্ত্রাস দমনে অন্তর্বর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে, ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার দুপুরে নিজের ফেসবুক পাতায় দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন,
“কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা মতভিন্নতার কারণে এ ধরনের সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি এ ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান এবং আহত ওসমান হাদির পরিপূর্ণ সুস্থতা কামনা করেন।

এই ঘটনার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লেখেন,
“আল্লাহ আমার ভাইকে বাঁচাইয়া রাখো।”

এছাড়া দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন,
“জান দেব, তবু জুলাই দেব না”—ওসমান হাদি।

এই হামলার ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কারা বেরিয়ে আসে এবং সরকার কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

Show More

M.R Raihan

নতুন কিছু শিখতে ভাল লাগে এবং শেখা জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে নলেজ শেয়ারিং করতে ভাল লঅগে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button