
শরীফ ওসমান হাদি: এক বিপ্লবীর বীরোচিত অবদান ও শোকাবহ পরিণতি
“মসজিদের পাশে আমার কবর দিও ভাই,
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।”
কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কালজয়ী উচ্চারণ যেন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা শরীফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রে। বিপ্লবী এই নেতার চিরনিদ্রার ঠিকানা হতে যাচ্ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই।
”হাদ“ যার নামের অর্থেই পথ প্রদর্শক শব্দটি জড়িয়ে আছে। নামের অর্থের মতো করেই কাজ করতে গিয়েই তার জীবন কাল হয়ে দাঁড়ায়।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই দাফন করা হবে শরীফ ওসমান হাদিকে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই দাফন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে।
শুক্রবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের জরুরি অনলাইন বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সাইফুদ্দীন আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওসমান হাদির পরিবারের চাওয়া এবং সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের চিঠির প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দাফনকে ঘিরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাহিত। ওই চত্বরে আরও কয়েকজন শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীর কবর রয়েছে।
মরদেহ দেশে পৌঁছেছে, জানাজা সংসদ ভবনে
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি বিমানবন্দরে গ্রহণ করেন সরকারের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। পরে কঠোর নিরাপত্তায় মরদেহ রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে রাখা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, শনিবার দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ওসমান হাদির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজাকে ঘিরে সংসদ ভবন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ড্রোন ওড়ানো এবং ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এদিকে হাদির মৃত্যুতে শনিবার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ড ও চিকিৎসার বিবরণ
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর পানির ট্যাংকি এলাকার বক্স কালভার্ট রোডে গণসংযোগকালে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন শরীফ ওসমান হাদি। গুলিটি তার মাথায় লাগে। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১৮ তারিখ) রাতে তিনি মারা যান।
এক সপ্তাহ হাসপাতালের বেডে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করে এই লড়াকু যোদ্ধা বৃহস্পতি দিবাগত রাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তার বীরোচিত জীবনের ইতি টানেন।
তার মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর কফিন ছুঁয়ে সহযোদ্ধারা হাদির দেখানো পথে এগিয়ে যাওয়ার এবং তার হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার করেন।
মুহূর্তের মধ্যেই শোকের সেই সমাবেশ ঝড়ের বেগে তুফানে রূপ নেয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শোক মিছিল সংগঠিত হয়। উত্তেজিত জনতা ক্ষোভ সামলাতে না পেরে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে সবাইকে ধৈর্য ধারণ ও শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া, সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সবাইকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস। সংস্থাটির মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স এক বিবৃতিতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বিএনপিও এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র পরিকল্পিত ‘মব সন্ত্রাস’-এর নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিচারের দাবি করেছে।
রাজনৈতিক পরিচিতি
জুলাই অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া শরীফ ওসমান হাদি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। ওই লক্ষ্যে তিনি সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। গণসংযোগ চালানোর সময়ই তিনি গুলিবিদ্ধ হন।







